পদচারী-বান্ধব নগরের স্বপ্ন: স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নে স্থাপত্য ও পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পদচারী-বান্ধব নগরের স্বপ্ন: স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নে স্থাপত্য ও পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ

স্থপতি তামিম  avatar   
স্থপতি তামিম
পদচারী-বান্ধব নগরের স্বপ্ন: স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নে স্থাপত্য ও পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ
পদচারী-বান্ধব নগরের স্বপ্ন: স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নে স্থাপত্য ও পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত 'স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স ২০২৩'-এ দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর পরিকল্পনাবিদগণ...

সম্প্রতি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত 'স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স ২০২৩'-এ দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর পরিকল্পনাবিদগণ একমত পোষণ করেছেন যে, আধুনিক নগর পরিকল্পনায় পদচারী-বান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্যতা। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো দ্রুত বর্ধনশীল মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে পথচারীদের জন্য নিরাপদ, মসৃণ এবং সুগম পরিবেশ নিশ্চিত করা স্মার্ট সিটি ধারণার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো এখনও প্রকট। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং মোটরগাড়ি-কেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণের দীর্ঘদিনের প্রবণতা আমাদের শহরগুলোকে পদচারীদের জন্য প্রতিকূল করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ জন পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হন, যার একটি বড় কারণ হলো পথচারী-বান্ধব অবকাঠামোর অভাব এবং অপর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা। এই বাস্তবতায়, স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নের স্বপ্ন পূরণে স্থাপত্য ও পরিকল্পনার কৌশলগত পরিবর্তন এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের শহরগুলোর বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নগর পরিকল্পনায় পদচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত হয়েছে। শহরগুলোর মূল সড়ক থেকে শুরু করে উপশহরীয় রাস্তাগুলো পর্যন্ত, ফুটপাতগুলো হয় অবৈধ দখলদারিত্বের শিকার, নয়তো ভাঙাচোরা এবং ব্যবহার অনুপযোগী। এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যা - যেখানে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মূলত দ্রুত যানবাহন চলাচলের সুবিধার উপর জোর দেয়, কিন্তু মানুষের হাঁটার অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাবকে গৌণ করে দেখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, নতুন সড়ক নির্মাণ বা প্রশস্তকরণ প্রকল্পগুলোতে ফুটপাত, সাইকেল লেন, বা পথচারী ক্রসিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত স্থান বরাদ্দ করা হয় না, অথবা বরাদ্দকৃত স্থানও মানসম্মতভাবে নির্মিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফুটপাতের উচ্চতা, প্রস্থ এবং মসৃণতা এমন যে, বয়স্ক, শিশু বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তা ব্যবহার করা অত্যন্ত দুরূহ। এমনকি, পার্ক, খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত জনপরিসরগুলোর নকশাতেও পথচারী প্রবেশাধিকার এবং তার সংযোগের বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে, যা নাগরিক জীবনের গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। নগরীর সৌন্দর্য, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার জন্য যে পদচারী-বান্ধব পরিবেশ অপরিহার্য, তা নিশ্চিত করতে স্থাপত্য ও পরিকল্পনা পেশাজীবীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

এই চ্যালেঞ্জের মূলে রয়েছে অপর্যাপ্ত আইনি কাঠামো, দুর্বল প্রয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। 'আরবান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং অ্যাক্ট, ২০১০' সহ বেশ কিছু নীতি ও আইন থাকলেও, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রায়শই সম্ভব হয় না। এর একটি প্রধান কারণ হলো, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার অভাব এবং দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতির অপ্রতুলতা। প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় আধুনিক নগর পরিকল্পনা এবং স্মার্ট সিটি ধারণাকে বাস্তবে রূপান্তর করার জন্য যে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও মানবসম্পদ প্রয়োজন, তার অভাব রয়েছে। উপরন্তু, ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এক ধরনের নৈরাজ্য পরিলক্ষিত হয়, যেখানে নির্দিষ্ট ভূমি ব্যবহারের বিধিমালা প্রায়শই লঙ্ঘন করা হয়। সবুজ স্থান, উন্মুক্ত স্থান এবং পথচারী এলাকার জন্য নির্দিষ্ট ভূমি বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও, বাণিজ্যিক বা আবাসিক উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন নগর উন্নয়ন প্রকল্পেও পদচারী-বান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রায়শই সীমাবদ্ধতা দেখা যায়, অথবা বরাদ্দকৃত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হয়ে যায়। এর ফলে, স্মার্ট সিটি ধারণার মূল উপাদান যেমন - স্মার্ট গতিশীলতা, স্মার্ট জনপরিসর এবং স্মার্ট পরিবেশ - বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি টেকসই, পদচারী-বান্ধব নগর গড়ে তুলতে হলে স্থাপত্য নকশার প্রতিটি পর্যায়ে মানুষের চলাচল, নিরাপত্তা এবং স্বাচ্ছন্দ্যকে কেন্দ্রীয় ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যা বর্তমানে প্রায়শই অনুপস্থিত।

স্মার্ট সিটি উদ্যোগের খাত মোট বরাদ্দকৃত বাজেট (বিলিয়ন USD, ২০২৪) পদচারী-বান্ধব অবকাঠামোতে ব্যয় (শতাংশ) বাস্তবায়ন হার (শতাংশ)
স্মার্ট গতিশীলতা ও পরিবহন ১.৫ ১৫% ৬৫%
স্মার্ট জনপরিসর ও বিনোদন ০.৮ ২৫% ৫০%
স্মার্ট ইউটিলিটি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ২.০ ৫% ৭৫%
সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন ৪.৩ ১০% ৬২%

উৎস: বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং ADB এর যৌথ প্রতিবেদন, ২০২৪ (প্রাক্কলিত)।

সুপারিশ

  • 'আরবান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং অ্যাক্ট, ২০১০' এর আওতায় একটি সুনির্দিষ্ট 'পদচারী-বান্ধব নগর উন্নয়ন নীতিমালা' প্রণয়ন ও বাধ্যতামূলক করা। এই নীতিমালায় প্রতিটি নতুন ও বিদ্যমান সড়ক প্রকল্পে ফুটপাত, সাইকেল লেন, নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং এবং প্রতিবন্ধী-বান্ধব র‍্যাম্পের জন্য সুস্পষ্ট নকশা নির্দেশিকা (Design Guidelines) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রাজউক (RAJUK) এবং সকল সিটি কর্পোরেশনকে তাদের মাস্টার প্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (DAP)-এ এই নীতিমালাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বতন্ত্র মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এই সেলকে নিয়মিতভাবে প্রকল্পের অগ্রগতি ও গুণগত মান যাচাইয়ের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে, যাতে কোনো প্রকল্প পদচারী-বান্ধব মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনে 'স্মার্ট আরবান ডিজাইন ও প্ল্যানিং ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করা। এই ইউনিটে অভিজ্ঞ নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট এবং ট্র্যাফিক ইঞ্জিনিয়ারদের সমন্বয়ে একটি বহু-শৃঙ্খলাবদ্ধ দল (Multidisciplinary Team) থাকবে, যাদের প্রধান কাজ হবে পদচারী-বান্ধব অবকাঠামো ডিজাইন, প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি এবং বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা প্রদান করা। World Bank এবং ADB এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মাধ্যমে এই ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা আধুনিক স্মার্ট সিটি ধারণাগুলোকে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারে। এছাড়াও, এই ইউনিটগুলোকে নগরীর প্রতিটি প্রকল্পে জনঅংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা (Participatory Planning) নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে 'স্মার্ট আরবান রেজিলিয়েন্স ফান্ড' নামে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা। এই তহবিলের মূল লক্ষ্য হবে পদচারী-বান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে (সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা) সহজ শর্তে ঋণ ও অনুদান প্রদান করা। তহবিলের অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন, মোট তহবিলের কমপক্ষে ২০%) সরাসরি পদচারী-বান্ধব ফুটপাত, উন্মুক্ত জনপরিসর এবং সবুজ করিডোর নির্মাণে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এছাড়াও, 'ভূমি ব্যবহার বিধিমালা' কঠোরভাবে প্রয়োগ করে ফুটপাত ও জনপরিসর দখলমুক্ত রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো সম্মিলিতভাবে একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও পদচারী-বান্ধব নগর গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: স্থপতি তামিম

স্থপতি তামিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator