বাংলাদেশের অলিম্পিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস গেমস থেকে, যেখানে মাত্র একজন প্রতিযোগী অংশ নেন। এরপর থেকে প্রতিবারই বাংলাদেশ অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেছে, কিন্তু পদক তালিকায় বাংলাদেশের নাম কখনোই লেখা হয়নি। সম্প্রতি ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতি এবং যোগ্যতা অর্জনের চিত্র হতাশাজনক। হাতেগোনা কয়েকজন অ্যাথলেট ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও, নির্দিষ্ট ইভেন্টে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের সংখ্যা নগণ্য। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC)-এর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামোর দুর্বলতা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যের পথে এক বড় বাধা। রাজধানী ঢাকার বাইরে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যে সীমিত সংখ্যক স্টেডিয়াম ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর মান আন্তর্জাতিক স্তরের অ্যাথলেট তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি আন্তর্জাতিক মানের সিন্থেটিক ট্র্যাক, আধুনিক ইনডোর ট্রেনিং কমপ্লেক্স বা অত্যাধুনিক জিমনেশিয়ামের সংখ্যা হাতেগোনা। ফলস্বরূপ, সম্ভাবনাময় অ্যাথলেটরা পর্যাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় ফিটনেস ও দক্ষতা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পরিচালিত বার্ষিক বাজেটের একটি বড় অংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হলেও, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ অথবা বিদ্যমান সুবিধার আধুনিকায়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ দেখা যায় না। এর পাশাপাশি, খেলাধুলায় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব প্রকট। পুষ্টি, ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, বায়োমেকানিক্স এবং আঘাত প্রতিরোধে আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন প্রশিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ কোচ পুরনো এবং সেকেলে পদ্ধতিতেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য অকার্যকর।
আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার আরেকটি মূল কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদী এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির অনুপস্থিতি। দেশের বিশাল জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান অ্যাথলেটদের খুঁজে বের করা এবং তাদের সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য একটি সুসংগঠিত পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ থাকলেও, সেগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট 'অ্যাথলেট পাথওয়ে'তে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো নেই। এমনকি, বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ ও অনুদান গ্রহণ করে থাকে, বিশেষত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যুব উন্নয়ন খাতে। তবে, ক্রীড়া খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট ও বড় আকারের প্রকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে যাওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। যদিও World Bank 'বাংলাদেশ যুব দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প'-এর মতো উদ্যোগকে সমর্থন করে, যা পরোক্ষভাবে যুবকদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু এটি সরাসরি এলিট অ্যাথলেটিক্সে বিনিয়োগ নয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন যদি একটি সুচিন্তিত, দীর্ঘমেয়াদী ক্রীড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে অবকাঠামো নির্মাণ, কোচিং এবং প্রতিভা অন্বেষণকে অন্তর্ভুক্ত করে, তবেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে World Bank বা ADB-এর মতো সংস্থাগুলোর কাছে ক্রীড়া খাতের জন্য বিশেষ তহবিল সংগ্রহের প্রস্তাব রাখা সম্ভব হবে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অভাবই আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মঞ্চে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।
| বছর/ইভেন্ট | বাংলাদেশী অংশগ্রহণকারী (সংখ্যা) | পদক জয় (সংখ্যা) | যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট (কোটি টাকা) |
|---|---|---|---|
| ২০১৬ রিও অলিম্পিক | ৭ | ০ | ২২১.৩২ |
| ২০২০ টোকিও অলিম্পিক | ৬ | ০ | ১৩১.৯৪ |
| ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক (প্রাথমিক যোগ্যতা) | ওয়াইল্ড কার্ড/ইউনিভার্সালিটি প্লেস | ০ | ১৩৯.০০ (২০২৩-২৪ অর্থবছর) |
| দক্ষিণ এশিয়ান গেমস (শেষ ৩টি ইভেন্ট) | ২০০-৩০০ (গড়) | স্বর্ণ: ২৫-৪০ (গড়) | — |
উৎস: বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) রিপোর্ট, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বার্ষিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ সরকারের বাজেট নথি।
সুপারিশ
- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অবিলম্বে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ১৯৯৮' পর্যালোচনা করে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০২৫' প্রণয়ন করবে, যেখানে প্রতিভা অন্বেষণ (গ্রাম পর্যায় থেকে), বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ (পুষ্টি, ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, বায়োমেকানিক্স), আন্তর্জাতিক মানের কোচ নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, এবং কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক অর্থায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও পাঁচ বছর মেয়াদী বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC) যৌথভাবে 'এলিট অ্যাথলেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম' চালু করবে, যার আওতায় ২০২৮ ও ২০৩২ অলিম্পিকের জন্য কমপক্ষে ১০০ জন সম্ভাবনাময় অ্যাথলেটকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। এই প্রোগ্রামের জন্য তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার World Bank এবং ADB-এর 'মানবসম্পদ ও যুব উন্নয়ন' বিষয়ক বিদ্যমান বা প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট উপাদান হিসেবে অর্থায়নের প্রস্তাব করবে।
- বাংলাদেশ সরকার অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর 'জাতীয় বাজেটে' ক্রীড়া খাতের জন্য মোট বরাদ্দের কমপক্ষে ১% 'ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ গবেষণা' খাতে সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ করবে এবং এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন 'ক্রীড়া অডিট কমিটি' গঠন করবে, যার প্রতিবেদন প্রতি বছর জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক হবে।