প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম তালিকাভুক্তির পর বাস্তবতা: তথ্য-উপাত্তের সূক্ষ্ম বিচার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম তালিকাভুক্তির পর বাস্তবতা: তথ্য-উপাত্তের সূক্ষ্ম বিচার

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম তালিকাভুক্তির পর বাস্তবতা: তথ্য-উপাত্তের সূক্ষ্ম বিচার
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বনাম তালিকাভুক্তির পর বাস্তবতা: তথ্য-উপাত্তের সূক্ষ্ম বিচার
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক দিন দি...

সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত তিন বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) তালিকাভুক্ত হওয়া ৩৩টি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও)-এর প্রায় ৬০% তাদের ইস্যু মূল্য থেকে নিচে লেনদেন হচ্ছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরাচ্ছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং পুঁজিবাজারে পুঁজি সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং তালিকাভুক্তির পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে গভীর একটি সংযোগের অভাবকেই নির্দেশ করে। যখন কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে নতুন শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহ করে, তখন এর পেছনে থাকে সুদূরপ্রসারী আর্থিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মূল্য তৈরির অঙ্গীকার। কিন্তু তালিকাভুক্তির পর অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সেই অঙ্গীকার আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান তৈরি হয়, যা পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির আগমন একটি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মূলধন সংগ্রহের একটি কার্যকর উপায় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের দুটি প্রধান পদ্ধতি প্রচলিত আছে: ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতি এবং বুক-বিল্ডিং পদ্ধতি। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ইস্যু মূল্য পূর্বনির্ধারিত থাকে, যা সাধারণত কোম্পানির নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) এবং অতীত পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে, বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা (Qualified Institutional Buyers - QIBs) বিডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেয়ারের একটি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে অংশ নেন, যা পরবর্তীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণে সহায়তা করে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই উভয় পদ্ধতির তত্ত্বাবধান ও অনুমোদন দেয়, যাতে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায্য হয়। তবে, বুক-বিল্ডিং পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাজারের চাহিদা অনুযায়ী একটি ন্যায্য মূল্য খুঁজে বের করা, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক সময় যোগ্য বিনিয়োগকারীরা নিজেদের স্বার্থে উচ্চ মূল্যে বিড করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেন, যার ফলস্বরূপ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত মূল্যে শেয়ার কিনতে বাধ্য হন। তালিকাভুক্তির পর যখন এই কৃত্রিম চাহিদা কমে যায়, তখন শেয়ারের মূল্য দ্রুত হ্রাস পায়, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির শেয়ার মূল্যের পতন বা প্রত্যাশিত পারফরম্যান্সের অভাবের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করে। প্রথমত, অনেক সময় আইপিও প্রসপেক্টাসে ভবিষ্যৎ মুনাফার যে প্রক্ষেপণ (projection) দেখানো হয়, তা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। বিএসইসি কর্তৃক অনুমোদিত হলেও, এই প্রক্ষেপণগুলো অনেক ক্ষেত্রে অতি-আশাবাদী হয় এবং কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির পর সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়ত, কর্পোরেট সুশাসন ও স্বচ্ছতার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়মিতভাবে তাদের আর্থিক প্রতিবেদন সঠিক সময়ে প্রকাশ করে না অথবা প্রকাশিত তথ্যে অসঙ্গতি থাকে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরায়। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) শেয়ারের মালিকানা এবং লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করলেও, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব দূরীকরণে এর সরাসরি ভূমিকা সীমিত। তৃতীয়ত, বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক উপাদানও তালিকাভুক্ত কোম্পানির পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে। তবে, সুনির্দিষ্টভাবে আইপিও-পরবর্তী দুর্বল পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে কোম্পানির মৌলিক দুর্বলতা, অতি-মূল্যায়ন এবং দুর্বল কর্পোরেট সুশাসনই প্রধানত দায়ী। আইপিও ফান্ড ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, কারণ অনেক কোম্পানি প্রসপেক্টাসে উল্লিখিত উদ্দেশ্যে ফান্ড ব্যবহার না করে অন্য খাতে ব্যয় করে, যা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ বা মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয় না।

বছর আইপিও সংখ্যা (DSE ও CSE) তালিকাভুক্তির ১ বছর পর গড় পারফরম্যান্স (ইস্যু মূল্যের তুলনায়) ইস্যু মূল্যের নিচে লেনদেন হওয়া আইপিও-এর শতাংশ
২০২১ ১২ -১২.৮% ৬৬.৭%
২০২২ ১১ -৯.৫% ৫৪.৫%
২০২৩ ১০ -৬.২% ৫০.০%

উৎস: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষিত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক আইপিও অনুমোদনের পূর্বে কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয়ের প্রক্ষেপণ (projected earnings) এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতার ওপর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের দ্বারা একটি বাধ্যতামূলক 'ডু-ডিলিজেন্স' নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা উচিত, যা প্রসপেক্টাসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে এবং অতি-মূল্যায়ন প্রতিরোধ করবে।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) যৌথভাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট সুশাসন (Corporate Governance) এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করবে, যা নিয়মিতভাবে কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন এবং আইপিও ফান্ডের ব্যবহার নিরীক্ষা করবে এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে 'লিস্টিং রেগুলেশনস' অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে।
  • সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্মিলিতভাবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য আইপিও-পরবর্তী পারফরম্যান্সের সহজবোধ্য ডেটা অ্যানালাইসিস টুলস এবং শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম চালু করবে, যা বিনিয়োগকারীদেরকে কোম্পানির মৌলিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে এবং বাজারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator