শিক্ষা খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও জালিয়াতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিক্ষা খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও জালিয়াতি

মহিউদ্দিন নবী  avatar   
মহিউদ্দিন নবী
শিক্ষা খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও জালিয়াতি
শিক্ষা খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র: নিয়োগ বাণিজ্য ও এমপিও জালিয়াতি
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক গভীর দুর্নীতির দুষ্টচক্রে আবদ্ধ, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে এমপিওভুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে অনিয়ম ও অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ ...

বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক গভীর দুর্নীতির দুষ্টচক্রে আবদ্ধ, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে এমপিওভুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে অনিয়ম ও অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ প্রকট। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দুর্নীতির শেকড় এতটাই গভীরে বিস্তৃত যে, এটি এখন এক 'নিয়ম' হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি মেধা ও যোগ্যতাকে অবজ্ঞা করে অযোগ্যদের হাতে শিক্ষার ভবিষ্যৎ তুলে দিচ্ছে, যা জাতির মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এই খাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন শিক্ষা খাতের অন্তত ১৪টি চরম দুর্নীতিপ্রবণ খাত চিহ্নিত করেছে। দুদক শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, যেকোনো মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি অনুসন্ধান বা তদন্ত করবে বলে জানিয়েছে। বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ডজনখানেক ভিসির বিরুদ্ধে নিয়োগে জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এছাড়া, নর্দান ইউনিভার্সিটি ও শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও অর্থ আত্মসাৎ ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে। মাদারীপুরের ডাসারে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম এবং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে দুদক। অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসের (১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর) এক প্রতিবেদনে ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের চিত্র ধরা পড়েছে। এই অনিয়মের মধ্যে রয়েছে জাল বা ভুয়া সনদ, অগ্রহণযোগ্য সনদ, অবৈধ নিয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ এবং ১৭৬ একর সরকারি জমি বেহাত হওয়ার মতো ঘটনা। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, শিক্ষা খাতের দুর্নীতি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যা।

শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি এই খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক পর্যায়ে সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগেও ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, গভর্নিং বডি ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এই অর্থ আদায় করে থাকে। সম্প্রতি সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনায় হওয়া অনিয়ম ও সনদের সত্যতা নিশ্চিত করতে তদন্তে নেমেছে। প্রাথমিক ধাপে ঢাকাতেই অর্ধশত শিক্ষকের নথি যাচাই করে অন্তত ১২ জন শিক্ষকের সরাসরি সনদ জালিয়াতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) জাল সনদে শিক্ষকতার অভিযোগে মামলা দায়ের এবং বেতন-ভাতা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করেছে। বর্তমানে ৭৭ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শূন্য পদগুলোতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যাপারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে, এনটিআরসিএ-এর হাত থেকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা আবারও ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে, যা দেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মনে করেন ঘুষ-দুর্নীতি বাড়াবে।

এমপিওভুক্তি বা এমপিও বাণিজ্যও দুর্নীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির কাজে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বিভিন্ন কার্যালয়ে সেবাপ্রার্থীদের নির্ধারিত হারে ঘুষ দিতে হয় বা প্রভাবশালী মহল থেকে তদবির করাতে হয়। এমপিওভুক্তিতে জাল জালিয়াতি বাড়ছে, কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব ও অবহেলার কারণে গোপনীয় পাসওয়ার্ড স্থানীয় কম্পিউটার দোকানি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের হাতে চলে যাচ্ছে। এর ফলে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর তথ্য নিয়ে তৃতীয় পক্ষ ব্যবসায়িক ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। এমনকি মাদরাসার এমপিও যাচাইয়েও জালিয়াতির তথ্য ধরা পড়েছে। মাদারীপুরের ডাসারে নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে শশিকর শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও তার স্ত্রীর এমপিও বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সব দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং দুর্নীতি করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিক্ষা খাতের এই ব্যাপক দুর্নীতির কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক নাজুক অবস্থায়। মেধার অবমূল্যায়ন এবং অযোগ্যদের নিয়োগের ফলে শিক্ষার মান ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং অর্থলোভের কারণে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষাকার্যক্রম বাস্তবায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় নিয়ে বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে, যা আমলে নেওয়া হলে এ খাতে দুর্নীতি অনেক কমে আসত। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমন্বিত জনবল কাঠামোর অনুপস্থিতি এবং জনবল সক্ষমতার ঘাটতি সুষ্ঠু তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শনের অভাব তৈরি করছে, যা দুর্নীতি বিস্তারের অন্যতম কারণ।

সুপারিশ: শিক্ষা খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে শতভাগ স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াকে আরও ডিজিটালাইজড করে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে জালিয়াতির সুযোগ না থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে শিক্ষা খাতের চিহ্নিত ১৪টি দুর্নীতিপ্রবণ খাতে নিয়মিত ও নিবিড় তদন্ত পরিচালনা করতে হবে এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘোষিত 'জিরো টলারেন্স' নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং দুর্নীতির শ্বেতপত্র দ্রুত প্রকাশ করে জনসম্মুখে আনতে হবে। একই সাথে, টিআইবি-এর মতো গবেষণা সংস্থাগুলোর সুপারিশগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে শিক্ষা নীতি ও আইন প্রণয়নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষা খাতে সুশাসন নিশ্চিত হয় এবং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে ওঠে।


🔎 অনুসন্ধানে: মহিউদ্দিন নবী

মহিউদ্দিন নবী, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্য।

Nema komentara


News Card Generator