অপ্রকাশিত সত্য: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

রাইয়ান হোসেন  avatar   
রাইয়ান হোসেন
অপ্রকাশিত সত্য: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগ ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কর...

সম্প্রতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগ ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা স্মার্ট বাংলাদেশের রোডম্যাপের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে, তবে এর পেছনের অপ্রকাশিত সত্য এবং মূল চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। বর্তমানে, বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং খাত মূলত অ্যাসেম্বলি-ভিত্তিক, যেখানে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্সের মতো পণ্যগুলো সংযোজন করা হয়। কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর চিপ ডিজাইন ও ফ্যাব্রিকেশনের মতো উচ্চ-প্রযুক্তিগত মূল উপাদান তৈরিতে আমরা এখনো বহুলাংশে বিদেশ-নির্ভর। এই নির্ভরতা একদিকে যেমন আমাদের রপ্তানি সক্ষমতাকে সীমিত করছে, তেমনি অন্যদিকে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের অস্থিরতার মুখে স্থানীয় শিল্পকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে বিগত দশকে স্থানীয় অ্যাসেম্বলিং এবং ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, যা প্রধানত দেশীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্মার্টফোন এখন বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে আছে, যা সরকারের শুল্ক নীতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ফল। তবে, এই 'উৎপাদন' প্রক্রিয়া মূলত বিদেশি ব্র্যান্ডের নকশা ও প্রযুক্তিতে তৈরি যন্ত্রাংশ আমদানি করে স্থানীয়ভাবে সংযোজন করা। সেমিকন্ডাক্টর চিপ, যা আধুনিক ইলেকট্রনিক্স পণ্যের মস্তিষ্ক, তার ডিজাইন, ফ্যাব্রিকেশন (উৎপাদন) এবং টেস্টিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বিপুল বিনিয়োগের অভাব এখনো প্রকট। একটি দেশীয় চিপ ডিজাইন হাউস প্রতিষ্ঠা করা থেকে শুরু করে একটি ছোট আকারের ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, ক্লিনরুম সুবিধা এবং অত্যন্ত দক্ষ প্রকৌশলীদের প্রয়োজন, যার জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে VLSI (Very Large Scale Integration) ডিজাইন বা মাইক্রোইলেকট্রনিক্স নিয়ে গবেষণা সীমিত এবং শিল্প-ভিত্তিক প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ফলস্বরূপ, দেশীয় উদ্যোক্তারা চিপ ডিজাইনের বদলে তুলনামূলক সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসেম্বলিং মডেলের দিকে ঝুঁকছেন।

এই খাতের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ বাকি। BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) যদিও সফটওয়্যার শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন বা ইলেকট্রনিক্স হার্ডওয়্যার ফ্যাব্রিকেশনের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। BHTPA (বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ) এর অধীনে বিভিন্ন হাইটেক পার্কে ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট স্থাপন করা হলেও, এগুলি মূলত অ্যাসেম্বলিং এবং টেস্টিং-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। চিপ ডিজাইনের জন্য প্রয়োজনীয় EDA (Electronic Design Automation) টুলস, লাইব্রেরি এবং IP (Intellectual Property) কোর অ্যাক্সেসের খরচ অত্যন্ত বেশি, যা ছোট ও মাঝারি আকারের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় বাধা। এছাড়া, দেশীয় শিল্পে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। ICT Division যদিও বিভিন্ন ইনোভেশন ফান্ড এবং স্টার্টআপ প্রোগ্রাম চালু করেছে, সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত তহবিল এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শের অভাব বিদ্যমান। BTRC (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন) যদিও টেলিকমিউনিকেশন অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে, 5G/IoT ডিভাইসের স্থানীয় উৎপাদন ও পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম বরাদ্দ বা সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়নে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। এই খাতের উন্নয়নে a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম ডিজিটাল রূপান্তরে কাজ করলেও, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গভীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উচ্চমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরিতে তাদের আরও মনোযোগী হতে হবে।

দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে কেবল অ্যাসেম্বলিং মডেল থেকে বেরিয়ে এসে চিপ ডিজাইন, IP কোর ডেভেলপমেন্ট এবং এমনকি সীমিত পরিসরে ফ্যাব্রিকেশনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত জাতীয় কৌশল, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করবে। বৈশ্বিক বাজারে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং 5G প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো অপরিহার্য। কেবল বিদেশি বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল না থেকে, দেশীয় উদ্ভাবন এবং R&D-তে জোর দিতে হবে। বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, একাডেমিক-শিল্প সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি করা সম্ভব, যা বাংলাদেশকে উচ্চ-প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

খাত ২০১৯-২০ অর্থবছর (মিলিয়ন USD) ২০২৩-২৪ অর্থবছর (মিলিয়ন USD) প্রবৃদ্ধির হার (%) মন্তব্য
স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্যের উৎপাদন মূল্য ১,২০০ ৩,৫০০ ১৯১.৬৭% প্রধানত অ্যাসেম্বলি-ভিত্তিক
সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স কম্পোনেন্ট আমদানি ৮৫০ ১,৮০০ ১১২% চিপ, সার্কিট বোর্ড, রেজিস্টর, ক্যাপাসিটর ইত্যাদি
ইলেকট্রনিক্স পণ্য রপ্তানি ১২০ ৩৫০ ১৯১.৬৭% মূলত অ্যাসেম্বলড পণ্য
BHTPA হাইটেক পার্কে ইলেকট্রনিক্স/IT বিনিয়োগ ১০০ ৩৫০ ২৫০% তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট
ICT Division এর R&D তহবিল (সেমিকন্ডাক্টর সংক্রান্ত) ৩ ১০ ২৩৩.৩৩% প্রারম্ভিক পর্যায়, সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রকল্প

উৎস: বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BEML), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) ও ICT বিভাগ।

সুপারিশ

  • ICT Division একটি ‘জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর স্ট্র্যাটেজি ২০২৫’ প্রণয়ন করবে, যেখানে দেশীয় চিপ ডিজাইন ফার্মগুলোর জন্য প্রথম ৫ বছর কর্পোরেট কর মওকুফ এবং তাদের R&D খরচের ৫০% পর্যন্ত ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদানের বিধান থাকবে।
  • BASIS এবং a2i এর যৌথ উদ্যোগে, আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় একটি ‘অ্যাডভান্সড চিপ ডিজাইন ও টেস্টিং সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা প্রতি বছর কমপক্ষে ৩০০ প্রকৌশলীকে VLSI ডিজাইন, FPGA ডেভেলপমেন্ট এবং ASIC ভেরিফিকেশনে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেবে এবং দেশীয় চিপ ডিজাইন স্টার্টআপগুলিকে EDA টুলস ব্যবহারে সহায়তা করবে।
  • BHTPA এর অধীনে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন ইনকিউবেশন জোন’ স্থাপন করা হবে এবং BTRC এর সাথে সমন্বয় করে 5G/IoT ডিভাইসের প্রোটোটাইপ টেস্টিং ও সার্টিফিকেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা ও স্পেকট্রাম অ্যাক্সেস নিশ্চিত করার জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাইয়ান হোসেন

রাইয়ান হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator