অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত BIMSTEC পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির এক নতুন...

সম্প্রতি থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত BIMSTEC পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করে। একসময় সার্কের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংহতির স্বপ্ন দেখা হলেও, বর্তমানে তার স্থবিরতা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন মেরুকরণ এবং বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছে। এই পরিস্থিতিতে, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত BIMSTEC আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক বিকল্প পথ দেখাচ্ছে, যেখানে সদস্য দেশগুলোর `পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়` সক্রিয়ভাবে কাজ করছে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করতে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সার্ক (SAARC) তার প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার শিকার হয়ে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বাতিলের পর থেকে এই আঞ্চলিক সংস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সীমান্ত বিরোধ এবং সন্ত্রাসবাদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সার্কের উদ্দেশ্য পূরণে বারবার বাধা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংহতির মতো গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই BIMSTEC-এর মতো উপ-আঞ্চলিক জোটগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে গঠিত এই জোট বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়েছে। সার্কের মতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের জটিলতা এখানে তুলনামূলকভাবে কম, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সহায়ক। বিভিন্ন দেশের `পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়` এখন BIMSTEC-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ এবং সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

আঞ্চলিক জোটগুলোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বহিরাগত শক্তির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যা শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশগুলোর অবকাঠামো খাতে বড় পরিবর্তন আনছে। তবে এর পাশাপাশি ঋণের বোঝা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়ে এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে প্রতিহত করতে চাইছে, যেখানে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এক জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তাদের `পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়`গুলো একদিকে যেমন নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা উভয়ই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, যাতে কোনো একটি শক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়ানো যায়। এই কৌশলগত ভারসাম্যের খেলা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিকে আরও গতিশীল ও 예측যোগ্য করে তুলেছে। এই বহুমাত্রিক প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলছে, যা তাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। সীমান্ত সংঘাত, আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও মানব পাচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই অঞ্চলের দেশগুলোকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে। যদিও সার্কের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাঠামো দুর্বল, কিন্তু এর বাইরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে (UN Peacekeeping Operations) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই দেশগুলো তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখছে। এই অংশগ্রহণ কেবল বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন নয়, বরং এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাবও বৃদ্ধি করছে। এটি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য এক ধরনের 'সফট পাওয়ার' প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করে, যা তাদের আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে। এই শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করতেও সহায়ক হতে পারে, যদি দেশগুলো এই অভিজ্ঞতাকে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারে।

দেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী সংখ্যা (২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি অনুযায়ী) গুরুত্বপূর্ণ মিশনসমূহ
বাংলাদেশ ৭,৩০৯ MONUSCO (DR Congo), MINUSCA (CAR), UNMISS (South Sudan)
নেপাল ৬,২১৬ MINUSCA (CAR), UNMISS (South Sudan), MONUSCO (DR Congo)
ভারত ৬,০৯৭ UNMISS (South Sudan), MONUSCO (DR Congo), UNDOF (Golan Heights)
পাকিস্তান ৪,১৯৯ MINUSCA (CAR), MONUSCO (DR Congo), UNMISS (South Sudan)
শ্রীলঙ্কা ৫৬৩ MINUSCA (CAR), UNIFIL (Lebanon)
ভুটান ১৭ MINUSCA (CAR)
সর্বমোট (দক্ষিণ এশিয়া) প্রায় ২৪,৪০০+ বিশ্বের প্রায় সকল প্রধান শান্তিরক্ষা মিশনে উল্লেখযোগ্য অবদান

উৎস: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, UN Peacekeeping (United Nations), ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সুপারিশ

  • সার্ক সনদের ধারা ৭ (Article 7 of SAARC Charter) সংশোধন করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর `পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়` পর্যায়ে একটি 'বিশেষ সঙ্কট নিরসন কমিটি' (Special Crisis Resolution Committee) গঠন করা, যা আঞ্চলিক বিভেদ নিরসনে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারবে এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও নমনীয় করবে।
  • BIMSTEC সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে 'BIMSTEC কানেক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান' (BIMSTEC Connectivity Master Plan) বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং একটি স্বাধীন 'BIMSTEC অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল' (BIMSTEC Infrastructure Development Fund) গঠন করা, যা সদস্য দেশগুলোর `পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়` দ্বারা পরিচালিত হবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে।
  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে (UN Peacekeeping Operations) দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর যৌথ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি 'দক্ষিণ এশীয় শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' (South Asian Peacekeeping Training Centre) প্রতিষ্ঠা করা, যা `পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়` এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল তৈরিতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator