সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আবাসন ও রিয়েল এস্টেট খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিদ্যমান নীতিগত দুর্বলতা এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর সফল মডেলের সাথে বাংলাদেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হলেও, সুনির্দিষ্ট ও আকর্ষণীয় নীতিমালার অভাবে এই খাত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ করে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্পত্তি ক্রয় ও মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা, কর কাঠামো এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাতকে প্রতিযোগিতার দিক থেকে পিছিয়ে রাখছে।
বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট ও আবাসন খাত অভ্যন্তরীণ চাহিদা দ্বারা চালিত হলেও, এর আন্তর্জাতিকীকরণের সম্ভাবনা ব্যাপক। বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ এই খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলেও, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আশানুরূপ নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রিয়েল এস্টেট খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেকটাই কম, যা মূলত শিল্প ও সেবা খাতের বিনিয়োগের তুলনায় নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের রিয়েল এস্টেট খাতে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বিভিন্ন ধরনের দীর্ঘমেয়াদী ভিসা, সহজ শর্তে সম্পত্তি ক্রয় এবং কর ছাড়ের মতো প্রণোদনা চালু করেছে, যা তাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া, সম্পত্তি হস্তান্তরের উচ্চ কর এবং বিদেশি নাগরিকদের জন্য স্থায়ী মালিকানা সংক্রান্ত আইনি সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যদিও বিনিয়োগ সহজীকরণে কাজ করছে, তবে আবাসন খাতের সুনির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতাগুলো মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাতকে তুলে ধরতে হলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর মাধ্যমে বিদেশে আবাসন মেলার আয়োজন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও, তা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REITs) চালু করার উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন, যা তারল্য বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা আনয়নে সহায়ক। তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে REITs এর প্রচার এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এর সুবিধাগুলো আরও স্পষ্ট করা জরুরি। সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো দেশগুলো তাদের REITs কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এই যন্ত্রটিকে আরও সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করতে NBR এর কর নীতিমালায় সংস্কার প্রয়োজন, যাতে মুনাফা প্রত্যাবাসন ও ডিভিডেন্ডের উপর করের বোঝা কমানো যায়। এই খাতকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হলে, শুধু অভ্যন্তরীণ নীতির সংস্কারই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য একটি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
| খাত/সূচক | বাংলাদেশ (২০২২) | মালয়েশিয়া (২০২২) | থাইল্যান্ড (২০২২) | সিঙ্গাপুর (২০২২) |
|---|---|---|---|---|
| রিয়েল এস্টেট খাতে FDI (বিলিয়ন USD) | ০.১ | ২.৮ | ১.৭ | ৯.৫ |
| সম্পত্তি নিবন্ধন ফি (% সম্পত্তির মূল্যের) | ৮-১০% | ৩-৪% | ১-২% | ১-৩% |
| আবাসন খাতে গড় মূল্য বৃদ্ধি (বার্ষিক %) | ৫.৫% | ৩.২% | ২.১% | ৬.৮% |
| REITs বাজার মূলধন (বিলিয়ন USD) | ০.০৫ (২০২৩) | ১৪.৫ | ১১.৩ | ৮৯.৭ |
| বিদেশি মালিকানার সীমা (আবাসিক) | কিছু বিধিনিষেধসহ | নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে | দীর্ঘমেয়াদী লিজ | পূর্ণ মালিকানা |
উৎস: NBR, BSEC, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, UNCTAD World Investment Report, ২০২৩ এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ভূমি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ।
সুপারিশ
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আবাসন খাতে সম্পত্তি ক্রয় ও হস্তান্তরে প্রযোজ্য কর কাঠামো সরলীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী কর অবকাশের ব্যবস্থা করবে, যা মালয়েশিয়ার 'মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম' (MM2H) প্রোগ্রামের আদলে প্রণীত হতে পারে।
- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REITs) এর কাঠামোকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করতে মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করবে এবং বিদেশি মুদ্রায় লেনদেন ও ডিভিডেন্ড বিতরণের আইনি বাধা দূর করতে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে।
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর মাধ্যমে বিদেশি দূতাবাস ও বাণিজ্য মিশনগুলোর সাথে সমন্বয় করে বৈশ্বিক রিয়েল এস্টেট মেলাগুলোতে বাংলাদেশের আবাসন খাতের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একক জানালা সেবা (One Stop Service) চালু করবে, যা ভূমি নিবন্ধন, ইউটিলিটি সংযোগ এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে সহায়তা করবে।