নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

রেহানা আক্তার  avatar   
রেহানা আক্তার
নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিজয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই সাফল্য শুধু মাঠে নয়, বরং নারী ক্র...

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিজয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই সাফল্য শুধু মাঠে নয়, বরং নারী ক্রীড়াবিদদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের জন্য কাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে এনেছে। যদিও এই মেয়েরা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে, তবুও তাদের পথচলা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন ক্রীড়া উন্নয়ন প্রকল্পের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য নির্দিষ্ট কাঠামোগত সুবিধা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে, যা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে জোর দিলেও, ক্রীড়া খাতে তাদের সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগের সুফল এখনো তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যা সামগ্রিক ক্রীড়া ইকোসিস্টেমের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সুবিধা বলতে কেবল খেলার মাঠ নয়, বরং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আবাসিক সুবিধা, আধুনিক ব্যায়ামাগার, মেডিকেল ও ফিজিওথেরাপি ইউনিট, পুষ্টি সহায়তা, এবং নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থাকেও বোঝায়। বর্তমানে, দেশের অধিকাংশ ক্রীড়া স্থাপনা পুরুষ ক্রীড়াবিদদের চাহিদা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য পৃথক ড্রেসিং রুম, টয়লেট বা নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা প্রায়শই অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, অনেক জেলা স্টেডিয়ামে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য সুরক্ষিত হোস্টেল বা মহিলা প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে, যা বিশেষত গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা শুধু তাদের শারীরিক দক্ষতাকে প্রভাবিত করে না, বরং মানসিক চাপ এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণও বটে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেক প্রতিভাবান নারী ক্রীড়াবিদ একসময় খেলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, যা দেশের ক্রীড়া ভান্ডারের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' রিপোর্টে প্রায়শই নারীর ক্ষমতায়নের কথা উল্লেখ করলেও, ক্রীড়া খাতে সুনির্দিষ্টভাবে নারী-বান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে সরাসরি অর্থায়নের অভাবে এই খাতটি এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য কাঠামোগত সুবিধা উন্নয়নে বিনিয়োগের ঝুঁকি এবং সম্ভাবনা উভয়ই বিদ্যমান। প্রাথমিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চ ব্যয়ের একটি ঝুঁকি থাকলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা ও আধুনিক সরঞ্জামাদি নিশ্চিত হলে নারী ক্রীড়াবিদদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়, যা দেশের সুনাম বৃদ্ধি করে এবং যুবসমাজকে খেলাধুলায় আগ্রহী করে তোলে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, খেলাধুলায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নারী ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আরও বেশি দর্শক আকর্ষণ করে, যার ফলে ক্রীড়া সরঞ্জাম, পোশাক, এবং পর্যটন খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ADB তাদের 'স্ট্র্যাটেজি ২০৩০' ডকুমেন্টে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিলেও, বাংলাদেশের ক্রীড়া খাতে, বিশেষ করে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো নির্মাণে তাদের তহবিল ব্যবহারের সুযোগ এখনো সীমিত। বাংলাদেশ সরকার 'ক্রীড়া নীতি ২০১৮' এ লিঙ্গ সমতার কথা বললেও, এর বাস্তবায়ন ও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে, এই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, কার্যকর নীতি ও পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে এটি পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাপ শুধু পদক জয়ের সংখ্যা দিয়ে করা উচিত নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসকে বিবেচনায় নিতে হবে। একটি সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে নারী ক্রীড়াবিদরা শুধু মাঠেই নয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিতে পারবে। তাদের সাফল্য অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা যোগাবে এবং দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হবে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে দেশের প্রতিটি উপজেলায় নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য ন্যূনতম একটি মাল্টিপারপাস ইনডোর স্টেডিয়াম এবং একটি সুরক্ষিত আবাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। এর পাশাপাশি, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ক্রীড়া বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলোতে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষায়িত ফিজিওথেরাপি, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ইউনিট স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। এই ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে কেবল ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতি হবে না, বরং একটি সুস্থ, সবল ও লিঙ্গ সমতাপূর্ণ সমাজ গঠনেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক নারী ক্রীড়া প্রকল্পে বরাদ্দ (কোটি টাকা) নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রকল্প সংখ্যা জাতীয় পর্যায়ে নারী ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি (শতাংশ)
২০১৮-১৯ ৪৫.২০ ১২%
২০১৯-২০ ৫০.৫০ ১৪%
২০২০-২১ ৫২.৩০ ১৫%
২০২১-২২ ৬০.০০ ১৮%
২০২২-২৩ (প্রাক্কলিত) ৬৫.৫০ ২০%

উৎস: বাংলাদেশ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP) প্রতিবেদন; জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় নারী ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৫' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও হোস্টেল নির্মাণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা এবং একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ কাঠামো নির্ধারণ করা থাকবে।
  • বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে 'নারী ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে, যা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ক্রীড়া কমপ্লেক্সগুলোতে নারী-বান্ধব সুবিধা (যেমন - পৃথক ড্রেসিং রুম, স্যানিটারি হাইজিন সুবিধা, নিরাপদ আবাসন) নিশ্চিত করবে এবং এডিবি'র 'Gender Equality and Social Inclusion (GESI) Operational Plan' এর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন, ১৯৯২ (সংশোধিত) এর আওতায় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের বার্ষিক বাজেটের ন্যূনতম ২৫% নারী ক্রীড়াবিদদের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতায় ব্যয় করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এর নিয়মিত নিরীক্ষা (audit) নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা আক্তার

রেহানা আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator