একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক: নিষিদ্ধের ঘোষণা নাকি বাস্তবায়নের ফাঁকি?
২০২০ সালের এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় উপকূলীয় এলাকা, হোটেল, মোটেল ও পর্যটন কেন্দ্রে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এই ঘোষণা দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসিত হলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। চার বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের বড় বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার চোখে পড়ে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের পর প্লাস্টিক উৎপাদন ও প্যাকেজিং শিল্পে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের দুর্বল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং কার্যকর তদারকির অভাবে তা কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে: আমরা কি কেবল ঘোষণার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি, নাকি এই সমস্যার মূলে গিয়ে একটি টেকসই সমাধানের দিকে এগোতে পারছি?
বাংলাদেশের প্লাস্টিক উৎপাদন ও প্যাকেজিং শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, এর পরিবেশগত প্রভাব দিন দিন উদ্বেগজনক হচ্ছে। বিশেষ করে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যাপকতা পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। World Bank-এর 'Plastic Waste Management in Bangladesh: A Circular Economy Perspective' শীর্ষক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০০ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের প্রায় ৩০-৩৫% সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার করা যায়, বাকি অংশ পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিকল্প উপাদানের অভাব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের জন্য অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এই সমস্যার মূল কারণ। শিল্প মালিকদের মতে, বিকল্প পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় এবং ভোক্তাদের মধ্যে এর চাহিদা কম থাকায় তারা একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের উৎপাদন থেকে সরে আসতে দ্বিধা করছেন। এই শিল্পখাতে কর্মরত শ্রমিকদের জীবিকাও একটি চিন্তার কারণ, যা এই পরিবর্তনের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকার এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই অচলাবস্থা থেকে বের হওয়া কঠিন।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বাংলাদেশের প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সহায়তা প্রদানে আগ্রহী হলেও, এর কার্যকর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। Asian Development Bank (ADB) এবং World Bank-এর মতো সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময় প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোটি কোটি ডলারের প্রকল্প ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের শহরাঞ্চলে বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার উন্নয়নে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা উল্লেখযোগ্য। তবে, এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন গতি অত্যন্ত ধীর। উদাহরণস্বরূপ, ADB-এর অর্থায়নে চলমান 'Sustainable Urban Waste Management Program' প্রকল্পের আওতায় আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ ও স্থানীয় প্রতিরোধের কারণে তা বিলম্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার প্লাস্টিক দূষণ রোধে 'প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১০' এবং 'পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭'-এর মতো আইন প্রণয়ন করলেও, এর প্রয়োগে যথেষ্ট দৃঢ়তা দেখা যায় না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা, বর্জ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তির অভাবে ভুগছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো প্লাস্টিক উৎপাদন থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো চক্রে এক ধরনের ফাঁক তৈরি করেছে, যা পরিবেশ দূষণকে আরও তীব্র করছে।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দেশের বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। সঠিক পরিসংখ্যান ও উৎসের অভাবে অনেক সময় নীতিনির্ধারকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। নিম্নে বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহারের একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সাল | মোট প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন (টন/দিন) | একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের অনুপাত (আনুমানিক %) | পুনর্ব্যবহার হার (আনুমানিক %) |
|---|---|---|---|
| ২০১৬ | ২,৭০০ | ৫০% | ২২% |
| ২০১৮ | ৩,০০০ | ৫২% | ২৬% |
| ২০২০ | ৩,২০০ | ৫৫% | ৩০% |
| ২০২২ | ৩,৬০০ | ৫৮% | ৩২% |
উৎস: World Bank, Department of Environment (আর্কাইভকৃত প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)
সুপারিশ
- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে 'একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০২০' এর কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে, প্লাস্টিক উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশকদের উপর নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন জোরদার করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে 'পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫' অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান প্রয়োগ করতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকার এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে প্লাস্টিক উৎপাদন ও প্যাকেজিং শিল্পে 'বর্ধিত উৎপাদনকারীর দায়িত্ব (Extended Producer Responsibility - EPR)' নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। এই নীতিমালার অধীনে, প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদের তাদের পণ্যের জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব নিতে হবে, যার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করা যেতে পারে।
- স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং সিটি কর্পোরেশনগুলোকে World Bank-এর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। এই কেন্দ্রগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জ্যকে অন্যান্য বর্জ্য থেকে পৃথক করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান হিসেবে শিল্প কারখানায় সরবরাহ করবে, যা প্লাস্টিক দূষণ কমাতে এবং একটি বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।