বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ মিলিয়ন টন কৃষি বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বিশাল অংশ অব্যবহৃত ব...

সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ মিলিয়ন টন কৃষি বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বিশাল অংশ অব্যবহৃত বা অনুপযুক্তভাবে নিষ্পত্তি হয়। এই বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে সার্কুলার ইকোনমির অপার সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছে। এই ব্যর্থতার কারণগুলো অনুসন্ধান এবং একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি, বিশেষ করে যখন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কৃষি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি হতাশাজনক। কৃষকদের মধ্যে বর্জ্য পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব প্রকট। মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়, ধান কাটার পর ধানের খড় পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা একদিকে বায়ুদূষণ ঘটায়, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। DAE (Department of Agricultural Extension) এর মতো সংস্থাগুলো কৃষকদের আধুনিক কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিলেও, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর সুনির্দিষ্ট ও ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। এর ফলে, কৃষকরা বর্জ্যকে সমস্যা হিসেবেই দেখে, সম্পদ হিসেবে নয়। উদাহরণস্বরূপ, সবজি ক্ষেতের অবশিষ্টাংশ, পচনশীল ফলমূল বা পশুপাখির বর্জ্য প্রায়শই খোলা স্থানে ফেলে রাখা হয়, যা রোগজীবাণু ছড়ানোর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানিকেও দূষিত করে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার জৈব সারের উৎস নষ্ট হচ্ছে, যা রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমাতে পারতো।

সার্কুলার ইকোনমির ধারণাকে কৃষি খাতে প্রয়োগের ক্ষেত্রে গবেষণা ও প্রয়োগের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান বিদ্যমান। BARI (Bangladesh Agricultural Research Institute) এবং BRRI (Bangladesh Rice Research Institute) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি বর্জ্য থেকে জৈব সার, বায়োগ্যাস, এবং পশুখাদ্য তৈরির কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। BARI বিভিন্ন ধরনের কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট এবং বায়োচার তৈরির পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছে, যা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। একইভাবে, BRRI ধানের খড়কে পশুখাদ্য, মাশরুম চাষের মাধ্যম এবং এমনকি বায়ো-ইথানল উৎপাদনে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এই গবেষণাগুলো মাঠ পর্যায়ে খুব কমই পৌঁছাচ্ছে। BARC (Bangladesh Agricultural Research Council) যদিও কৃষি গবেষণার সমন্বয়কারী সংস্থা, কিন্তু গবেষণা ফলাফলকে বাণিজ্যিকীকরণ বা বৃহৎ পরিসরে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এখনো সীমিত। পুঁজি বিনিয়োগের অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের দুর্বলতা এই ব্যবধান আরও বাড়িয়ে তুলছে।

নীতিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। যদিও পরিবেশ মন্ত্রণালয় 'সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট রুলস, ২০২১' প্রণয়ন করেছে, তবে কৃষি ও জৈব বর্জ্যের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা এবং সার্কুলার ইকোনমির জন্য একটি সমন্বিত ও বিশেষায়িত নীতিমালার অভাব রয়েছে। এই রুলসে শহুরে বর্জ্যের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু গ্রামীণ ও কৃষি বর্জ্যের বিশাল অংশ উপেক্ষিত। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা সীমিত, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। এছাড়া, জৈব সারের ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনা বা ভর্তুকি নীতি নেই, যা কৃষকদের রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারতো। এই নীতিগত শূন্যতার কারণে, কৃষি বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে না এবং সার্কুলার ইকোনমির মূল ভিত্তি - 'বর্জ্য নয়, সম্পদ' - এই মন্ত্রটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

কৃষি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমির বর্তমান চিত্র:

সূচক পরিমাণ/শতাংশ মন্তব্য
বার্ষিক মোট কৃষি বর্জ্য উৎপাদন (অনুমানিক) প্রায় ৪০ মিলিয়ন টন ধানের খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ, পশুপাখির বর্জ্য ইত্যাদি
জৈব সার উৎপাদনে ব্যবহৃত কৃষি বর্জ্য ১০-১৫% বেশিরভাগই ক্ষুদ্র পরিসরে কৃষকদের নিজস্ব উদ্যোগে
পশুখাদ্য ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত কৃষি বর্জ্য ২০-২৫% যেমন - ধানের খড় পশুখাদ্য হিসেবে
অব্যবহৃত বা অনুপযুক্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া কৃষি বর্জ্য ৬০-৭০% পরিবেশ দূষণের প্রধান উৎস
জাতীয় জৈব সার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা (২০৩০) ২ মিলিয়ন টন বর্তমান উৎপাদন এর চেয়ে অনেক কম
রাসায়নিক সারের উপর কৃষকদের নির্ভরতা উচ্চ (প্রায় ৮০% এর বেশি) মাটির স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও DAE এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণা থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় সার্কুলার ইকোনমি কৌশলপত্র (কৃষি ও খাদ্য)' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে কৃষি ও জৈব বর্জ্যের সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজারজাতকরণের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, অর্থায়ন প্রক্রিয়া এবং আইনগত কাঠামো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই কৌশলপত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।
  • DAE-কে BARI ও BRRI-এর গবেষণালব্ধ জ্ঞান (যেমন: ভার্মিকম্পোস্ট, বায়োচার, বায়োগ্যাস প্রযুক্তি) ব্যবহার করে প্রতিটি উপজেলায় কৃষি বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ও জৈব সার উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে কৃষকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য একটি 'কৃষি বর্জ্য থেকে সম্পদ' পাইলট প্রকল্প শুরু করতে হবে, যা পরবর্তীতে সারাদেশে সম্প্রসারিত হবে।
  • BARC-কে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আন্তঃ-সংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BARI, BRRI), বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কৃষি বর্জ্য থেকে সম্পদ রূপান্তরের জন্য সমন্বিত গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাণিজ্যিকীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এই টাস্কফোর্সকে জৈব সারের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং বাজার সম্প্রসারণের জন্য একটি মানসম্মত সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator