সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর বহির্বিভাগে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসা রোগীর সংখ্যায় উর্ধ্বমুখী প্রবণতা একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। গত এক দশকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের সমাজের এক গভীরতর সংকটের প্রতিচ্ছবি। NIMH-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে যেখানে প্রায় ১.৫ লাখ রোগী বহির্বিভাগে সেবা গ্রহণ করেছিলেন, সেখানে ২০২২ সালে এই সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বর্ধিত চাপেরই ইঙ্গিত। এই প্রেক্ষাপটে, কেবলমাত্র সংখ্যা নয়, বরং ডেটা-ভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের বর্তমান অবস্থা এবং এর ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলো নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। ঢালাও আশাবাদ বা নিছক হতাশা নয়, বরং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই এই খাতের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বহুবিধ চ্যালেঞ্জে জর্জরিত। একদিকে যেমন মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে সামাজিক ট্যাবু বা কুসংস্কার এখনও প্রবল, অন্যদিকে তেমনি এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং নীতিগত বাস্তবায়নের অভাব প্রকট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সমন্বিত উপস্থিতি এখনও অত্যন্ত সীমিত। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে মনোচিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পদ সৃষ্টি হলেও, অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো শূন্য পড়ে আছে অথবা অন্য কোনো চিকিৎসক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, যাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য কমপক্ষে ১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা উচিত, কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত অত্যন্ত কম, যা সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি করছে। এই ঘাটতি কেবল মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলর এবং মানসিক স্বাস্থ্য নার্সের মতো সহযোগী পেশাজীবীদের সংখ্যাও অপ্রতুল।
নীতিগত দিক থেকে, ২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও, এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এই আইনের অধীনে বিভিন্ন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব প্রায়শই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার একীভূতকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলেও, স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং রেফারেল সিস্টেমের দুর্বলতা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত সাইকোট্রপিক ড্রাগস-এর মান নিয়ন্ত্রণ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে। তবে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সম্প্রতি কিছু অননুমোদিত ওয়েলনেস সেন্টার ও ক্লিনিকের অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমও এই খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যেখানে মানসম্মত চিকিৎসা প্রদানের চেয়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যই প্রধান হয়ে উঠেছে।
কোভিড-১৯ মহামারীর সময়কালে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারীর সময় উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী এবং তরুণদের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মারাত্মক মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে। IEDCR বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করলেও, সমাজের সকল স্তরে এর বার্তা পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল তথ্য ও কুসংস্কার ছড়ানোও একটি উদ্বেগের বিষয়, যা সঠিক সেবা গ্রহণে মানুষকে নিরুৎসাহিত করে। এই পরিস্থিতিতে, তথ্য-প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রসারের মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ থাকলেও, তার কার্যকর প্রয়োগ এখনও সীমিত।
| সূচক | ২০১৯ | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|---|
| NIMH বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা (লাখ) | ১.৫ | ১.২ (মহামারী প্রভাব) | ১.৮ | ২.১ | ২.৩ |
| জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য বাজেটের অংশ (মোট স্বাস্থ্য বাজেটের%) | ০.৫% | ০.৪৫% | ০.৫২% | ০.৫৩% | ০.৫৪% |
| প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা | ০.৩৪ | ০.৩৫ | ০.৩৬ | ০.৩৭ | ০.৩৮ |
| DGDA অনুমোদিত সাইকোট্রপিক ড্রাগস উৎপাদনকারী কোম্পানির সংখ্যা | ২৫ | ২৭ | ২৮ | ২৯ | ৩০ |
| গ্রামীণ অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রবেশাধিকার (শতকরা) | ১০% | ৮% | ১২% | ১৪% | ১৫% |
উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রতিবেদন ও সমীক্ষা থেকে সংগৃহীত।
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন ও বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার একীভূতকরণের জন্য DGHS-এর অধীনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পদ সৃষ্টি ও পূরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিক নার্স এবং কাউন্সেলর প্রশিক্ষণের জন্য জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং IEDCR-এর সহযোগিতায় দেশব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও কলঙ্ক দূরীকরণে নিয়মিত ও ব্যাপকভিত্তিক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে।
- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে অত্যাবশ্যকীয় সাইকোট্রপিক ঔষধের সরবরাহ চেইন পর্যবেক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, একই সাথে অননুমোদিত ও মানহীন ওয়েলনেস সেন্টারগুলির বিরুদ্ধে Mental Health Act, 2018 অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।