সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: দুর্নীতির জালে আটকা কোটি মানুষের স্বপ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: দুর্নীতির জালে আটকা কোটি মানুষের স্বপ্ন

নাফিজা আক্তার  avatar   
নাফিজা আক্তার
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: দুর্নীতির জালে আটকা কোটি মানুষের স্বপ্ন
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: দুর্নীতির জালে আটকা কোটি মানুষের স্বপ্ন
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এক মহৎ উদ্যোগ। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ম...

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এক মহৎ উদ্যোগ। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মহৎ উদ্যোগটি বর্তমানে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জালে আটকা পড়েছে। প্রকৃত সুবিধাভোগীরা প্রায়শই তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে অযোগ্য ও স্বচ্ছল ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির মাধ্যমে এই সুবিধার ভাগ বসাচ্ছেন। এর ফলে কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির এই হতাশাজনক চিত্র বারবার উঠে এসেছে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক সম্মেলনে উল্লেখ করেন যে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রায় ৫০ শতাংশই 'ভূতুড়ে' বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত উপকারভোগী। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ভাতাভোগীদের ৪৬ শতাংশই ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন, যার কারণে শুধু বিধবা ও বয়স্ক ভাতা খাতে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদন (মে ২০২৩) আরও বিশদভাবে তুলে ধরেছে যে, বয়স্ক ভাতার শর্ত পূরণ করে না এমন ভাতাভোগীর সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, বিধবা ভাতার ভূমিহীন শর্ত পূরণ করে না এমন ২৩ শতাংশ, এবং গরিব না হয়েও ত্রাণ পায় এমন সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের 'হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে' অনুযায়ী, দেশের ৫৩.৯% দরিদ্র মানুষ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একটি বিশাল অংশ প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, বরং অপচয় ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছে।

দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনাগুলো প্রায়শই স্থানীয় পর্যায়ে সংঘটিত হয়, যেখানে জনপ্রতিনিধিদের প্রভাব একটি বড় কারণ। উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা অনেক সময় ভোট, ভোটার এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বিবেচনা করে তালিকা তৈরি করেন, যা প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ করে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা এই দুর্নীতির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করলেও ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এছাড়া, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বিধবা ভাতা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে গিয়ে এক সমাজকর্মী 'আপস-মীমাংসার' প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানা গেছে, যা তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদানে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানববন্ধন হয়েছে, যেখানে প্রতিবন্ধী নন এমন ব্যক্তি এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে অর্থের বিনিময়ে 'সুবর্ণ কার্ড' তৈরি করে ভাতার আওতায় আনার অভিযোগ উঠেছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির এই ব্যাপক অনিয়মের মূলে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাব। উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, কর্মসূচির যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং অনিয়ম ধরা পড়লেও শাস্তির অপ্রতুলতা এই সমস্যাকে আরও গভীর করেছে। কর্মসূচিগুলোর খণ্ডিত কাঠামোও একটি বড় সমস্যা; বর্তমানে ১৪৩টি কর্মসূচি থাকলেও এর মধ্যে ৯৫টি প্রায় একই ধরনের, যা অর্থায়নের অপচয় ঘটায় এবং প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ায়। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশের কম ব্যয় এবং লক্ষ্যভ্রষ্টতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এছাড়া, শহর অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা এই কর্মসূচির আওতায় খুবই সীমিত সুবিধা পাচ্ছেন, যা বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বলেছেন যে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে দুর্নীতির তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য সংস্থা কাজ করছে। সরকার একটি জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার তৈরির কাজ করছে, যা ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরিদ্রদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে। এছাড়া, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) প্রবর্তন এবং ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় আরও ৪ লাখেরও বেশি উপকারভোগী অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে বিশ্লেষকরা টাকা বিতরণে দুর্নীতি রোধে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই উদ্যোগগুলো ইতিবাচক হলেও, এর কার্যকর বাস্তবায়নই পারে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে দুর্নীতির জাল থেকে মুক্ত করে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দিতে।

সুপারিশ: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একক ক্ষমতা হ্রাস করে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজভিত্তিক, ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করতে হবে, যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত দরিদ্রদের তালিকা তৈরি হবে। এই তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা এবং অযোগ্যদের বাদ দেওয়ার জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। এছাড়া, দুর্নীতির অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম রোধ করা যায়। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং শহর অঞ্চলের দরিদ্রদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও কোটা নির্ধারণ করে তাদের অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সম্প্রসারিত করে নগদ টাকা লেনদেন কমিয়ে আনতে হবে, যা দুর্নীতি কমানোর পাশাপাশি সুবিধাভোগীদের হয়রানি লাঘব করবে।


🔎 অনুসন্ধানে: নাফিজা আক্তার

নাফিজা আক্তার, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: সোশ্যাল সেফটি নেট (সামাজিক নিরাপত্তা)।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator