জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের… | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের ৭৮ বছরের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বারবার যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো – বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর ব্যর্থতা কি...

জাতিসংঘের ৭৮ বছরের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বারবার যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো – বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর ব্যর্থতা কি নীতি-প্রণেতাদের কৌশলগত ত্রুটি, নাকি এর মূল সিস্টেমের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা? এই প্রশ্নটি সম্প্রতি আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) গাজায় চলমান সংঘাত নিরসনে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাশ করতে হিমশিম খাচ্ছে। একাধিক ভেটো ক্ষমতার প্রয়োগ এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীন প্রয়োগকে এক গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) রায় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘনের ঘটনা যখন প্রতিনিয়ত ঘটছে, তখন এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

জাতিসংঘ সনদের প্রথম অধ্যায়ে সুস্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা, যা পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) হাতে ন্যস্ত, প্রায়শই এই উদ্দেশ্য পূরণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যখন কোনো স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র তাদের জাতীয় স্বার্থ বা মিত্র রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার্থে ভেটো প্রয়োগ করে, তখন তা আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে এবং জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। উদাহরণস্বরূপ, সিরিয়া, ইউক্রেন বা ফিলিস্তিন ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের নিষ্ক্রিয়তা প্রমাণ করে যে, নীতি-প্রণেতারা বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এই ভেটো ক্ষমতা কেবল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য প্রায়শই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থেকে যাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) রায় বা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (ICC) নির্দেশাবলীও অনেক সময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এর পেছনে নিরাপত্তা পরিষদের ঐকমত্য ও সমর্থন অপরিহার্য।

কেবল নিরাপত্তা পরিষদই নয়, জাতিসংঘের অন্যান্য অঙ্গসংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছে। সাধারণ পরিষদ (General Assembly) যদিও সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাশ করে, কিন্তু এর প্রস্তাবগুলো আইনত বাধ্যতামূলক নয়, বরং নৈতিক সমর্থন হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেকার আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করে এবং রায় প্রদান করে, কিন্তু এর রায় কার্যকর করার ক্ষমতা চূড়ান্তভাবে নিরাপত্তা পরিষদের ওপর নির্ভরশীল, যা আবারও ভেটো সমস্যার সম্মুখীন। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ICC) ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার করে, কিন্তু এর এখতিয়ার সীমিত, কারণ অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র এর রোম সংবিধি অনুমোদন করেনি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা সীমিত হওয়ায়, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবসময়ই জাতিসংঘের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক আইনের সার্বজনীন প্রয়োগের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক আইনকে সমর্থন করে। তবে এই সংস্থাগুলোও নিজেদের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এবং ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে অনেক সময় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ আরও জটিল হয়ে ওঠে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, যেখানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান সেনা ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশ। এই মিশনগুলো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনতে কাজ করে। তবে, শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর সাফল্য প্রায়শই তাদের ম্যান্ডেট, পর্যাপ্ত জনবল ও সম্পদের প্রাপ্যতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। যখন এই বিষয়গুলোতে ঘাটতি দেখা যায়, তখন মিশনগুলো তাদের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে। সাম্প্রতিক সময়ে, কিছু শান্তিরক্ষা মিশনে দেখা গেছে যে, স্থানীয় সরকারের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐকমত্যের অভাবে তারা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছে না। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, শুধুমাত্র নীতি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ বৈশ্বিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।

প্রতিষ্ঠানের নাম/বিবরণ বাংলাদেশ সম্পর্কিত তথ্য (২০২৩-২০২৪) আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) ১,০০০+ সামরিক ও পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশগুলির মধ্যে অন্যতম (শীর্ষ ৫-এর মধ্যে)। মোট ৭,৪৬১ জন সেনা ও পুলিশ সদস্য (ফেব্রুয়ারি ২০২৪)। জাতিসংঘের ১২টি সক্রিয় শান্তিরক্ষা মিশনে প্রায় ৮০,০০০+ কর্মী নিয়োজিত। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোর কারণে কিছু মিশনে ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) ভেটো ক্ষমতা নেই। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে ভেটো ক্ষমতার সংস্কারের পক্ষে বাংলাদেশের জোরালো সমর্থন। স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর (P5) দ্বারা ভেটো প্রয়োগের হার বৃদ্ধি (যেমন, ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া সিরিয়া ও ইউক্রেন ইস্যুতে ৩০+ বার ভেটো দিয়েছে; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিন ইস্যুতে ১০+ বার ভেটো দিয়েছে)।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলায় সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমর্থন। ২০২৩ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ সংক্রান্ত মামলা সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিরোধের শুনানি চলমান। অনেক রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং।
BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় ভূমিকা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
সার্ক (SAARC - সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়। অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে কার্যক্রম স্থবির, যা আঞ্চলিক স্তরে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ ও সহযোগিতার সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।

উৎস: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বিভাগ, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ওয়েবসাইট, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ওয়েবসাইট, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা সংস্কারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করা। এই প্রস্তাবে স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ভেটো প্রয়োগের ক্ষেত্রে 'দায়িত্বশীলতা চুক্তি' (Code of Conduct) মেনে চলতে বাধ্য করা এবং গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা সীমিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
  • আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি নতুন রেজোলিউশন (যেমন: 'ICJ রায় বাস্তবায়ন তদারকি কমিটি' গঠন) প্রণয়ন করা, যা নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো দ্বারা প্রভাবিত না হয়েও রায় বাস্তবায়নে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।
  • আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC-এর মধ্যে 'আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি' (Regional Security Cooperation Treaty) প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদ মেনে আঞ্চলিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মধ্যস্থতার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator