বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এর অধীনস্থ কাস্টমস বিভাগ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম এবং রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় জর্জরিত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে, যেখানে এনবিআর ও কাস্টমসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা সরাসরি জড়িত। এসব ঘটনা একদিকে যেমন সরকারের কোষাগারকে শূন্য করছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)-এর সাম্প্রতিক তদন্ত ও অভিযানে এসব অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে কাস্টমস বিভাগে সংঘটিত বেশ কিছু বড় ধরনের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত জুলাই ২০২৬-এ, মিথ্যা রপ্তানি দেখিয়ে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা অর্থ পাচার এবং সরকারের ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার প্রণোদনা আত্মসাতের অভিযোগে ১১ জন কাস্টমস কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই কর্মকর্তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে পণ্য রপ্তানি দেখিয়ে ‘দো এম্পেক্স লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যাংকে জমা করেন, অথচ বাস্তবে কোনো রপ্তানি হয়নি। এছাড়াও, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমস গুদাম থেকে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৫০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ৫৫ কেজির বেশি সোনা চুরির ঘটনা তদন্ত করছে দুদক, যেখানে আটজন কাস্টমস কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা কাস্টমস হাউসের দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাজেদ ও এনামুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে নিষিদ্ধ ও উচ্চ শুল্কের পণ্য (যেমন ইলেকট্রিক সিগারেট, সেক্স টয়, ড্রোন) খালাস করে প্রতিদিন ১০-১২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না এবং ঘুষ লেনদেনের একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যার ফলস্বরূপ একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শেখ আবদুল হাদী সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে বিলাসবহুল গাড়ি শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনার অভিযোগেও একাধিক গাড়ি জব্দ করা হয়েছে, যেখানে ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপান্তরের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বশেষ, নিলামের আড়ালে ১২ কোটি টাকার গাড়ি আটকের ঘটনাও সামনে এসেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত আগস্ট ২০২৫-এ, নথি গায়েব করে ১৪৬ কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগে এনবিআরের তিন কর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। এনবিআর এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. তৈয়বুর রহমানের ৩৭ লাখ ১২ হাজার ৩০৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার চারটি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। ‘ছাগলকাণ্ডে’ আলোচিত সাবেক এনবিআর সদস্য মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ১.২৪ কোটি টাকার সম্পদ গোপন এবং ৫.৪০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। সাবেক এনবিআর সদস্য (কর) জিয়াউদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধেও ঢাকা, গাজীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ জমি, ফ্ল্যাট এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় একাধিক বাড়ি সহ শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। তার বিরুদ্ধে কর রেয়াত পাইয়ে দেওয়া এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের অভিযোগও রয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এপ্রিল ২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে কর ফাঁকির কারণে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, যার ৫০ শতাংশই কর্পোরেট খাত থেকে এসেছে। এস আলম গ্রুপের ১২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৫০০০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে এস আলম ভেজিটেবল অয়েল ও এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের বিরুদ্ধে যথাক্রমে ১৯১১ কোটি ও ১৬২০ কোটি টাকা ফাঁকির মামলা চলছে। একটি ব্যাটারি প্রস্তুতকারী কোম্পানি (জিউঝু ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড) প্রায় ৩১৮ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর জানিয়েছে। এমনকি, গুঁড়া মরিচ, ধনিয়া, আদা ও হলুদের নাম দিয়ে কম ভ্যাট সুবিধা নিলেও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের রেডিমিক্স মসলায় ১৫ থেকে ২০ ধরনের উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও তদন্তাধীন ।
রাজস্ব খাতের এই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সুশাসনের অভাব একটি বড় কারণ। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান নিজেই ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারকে ব্যাংক ও কাস্টমসের সম্মিলিত ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গত মে ২০২৫-এ, অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভেঙে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত স্বার্থের সংঘাত, জবাবদিহিতার অভাব এবং আইন প্রয়োগে অসঙ্গতিই এই সংস্কারের মূল কারণ। এই সংস্কারের লক্ষ্য একটি ন্যায্য, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এনবিআর অবশ্য রাজস্ব ফাঁকি রোধে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ৯ মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে মে ২০২৫) ১৬ হাজার ৫৭২টি অভিযান চালিয়ে ৯৯৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা মোট জড়িত ৬২৪৬ কোটি টাকার একটি অংশ। এছাড়াও, কর ফাঁকি ধরতে বিশেষ সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে এবং ৩৬ জন অতিরিক্ত কর কমিশনারকে বদলি করা হয়েছে। তবে, এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও দুর্নীতির ব্যাপকতা এবং পদ্ধতিগত দুর্বলতা এখনও প্রকট।
এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি এবং দুর্নীতি দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। যখন সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন একটি অসাধু চক্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আত্মসাৎ করে চলেছে। এই পরিস্থিতি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করছে। এনবিআর এবং কাস্টমসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির এই চিত্র দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব একইসঙ্গে এনবিআরের প্রধান হওয়ায় বিভ্রান্তি ও অদক্ষতা দেখা দিয়েছে, যা কার্যকর কর নীতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করেছে। কর আহরণকারীদের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য নিরপেক্ষ পদ্ধতির অভাব এবং পদোন্নতিতে কর্মক্ষমতার নির্দেশকের অনুপস্থিতি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করছে।
সুপারিশ: রাজস্ব খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি ও ফাঁকি রোধে নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, এনবিআর এবং কাস্টমসের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন, যেখানে তাদের সম্পদ বিবরণী নিয়মিত যাচাই করা হবে এবং সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থ পাচার রোধে ব্যাংক ও কাস্টমসের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে এবং ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো কৌশলগুলো কঠোরভাবে দমন করতে হবে। তৃতীয়ত, এনবিআর-এর কাঠামোগত সংস্কারকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। চতুর্থত, কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে এবং করদাতাদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ কর পরিশোধ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে ফাঁকির সুযোগ কমে আসে। পঞ্চমত, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। সর্বশেষ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে তথ্য প্রদানে উৎসাহিত করার জন্য একটি কার্যকর প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে, যেখানে তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং তাকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।