বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও… | আই নিউজ বিডি

বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন উপনির্বাচন এবং এর পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার ওপর জনগণের আস্থা হ্রাসের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে, ভোট প্রদানের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকা এবং বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন—এগুলো সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনের ফলাফলকেই প্রভাবিত করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের ধারণাকে দুর্বল করে তোলে। একটি কার্যকর নির্বাচনী ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিবেশই পারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার ভোটাধিকার প্রয়োগে নিরাপদ ও স্বাধীন অনুভব করবে।

এই আস্থার সংকট নিরসনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে নির্বাচনী আইন ও বিধিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (ডিভিএম) ব্যবহার এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল করা। তবে, এসব প্রযুক্তিগত উন্নতি সত্ত্বেও, নির্বাচনকালীন সহিংসতা, প্রভাব বিস্তার এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা জনগণের মধ্যে সংশয় তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়েরের পর তার সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ণ করেছে। `সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়`, বিশেষ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, নির্বাচনী আইন সংস্কার এবং এর বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যাতে অভিযোগগুলো সময়মতো এবং স্বচ্ছভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তি হয়। এছাড়াও, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবও বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বচ্ছতার ধারণাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর জনগণের আস্থাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, `World Bank` এবং `ADB` সহ উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে সুশাসন ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতাকে তাদের উন্নয়ন সহায়তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, দুর্নীতি দমন এবং সরকারি জবাবদিহিতার ওপর জোর দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, `World Bank` এর 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) রিপোর্টে বাংলাদেশের 'ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি' এবং 'কন্ট্রোল অব করাপশন' সূচকগুলোতে উন্নতির যে সুযোগ রয়েছে, তা বারবার উঠে এসেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ত্রুটি এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতার অভাব কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। `বাংলাদেশ সরকার`কে অবশ্যই এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে এবং একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে যা নির্বাচনকে প্রশ্নাতীতভাবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে পারে। এর জন্য কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সকল স্টেকহোল্ডারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

নির্বাচনের ধরন সাল ভোটার উপস্থিতি (%) অনিয়মের অভিযোগের সংখ্যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা সূচক (%)
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ ৮০.২০ ৫০,০০০+ ২৫
উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ২০১৯ (প্রথম ধাপ) ৪০.০০ ৫,০০০+ ২০
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০২০-২০২১ (গড়) ৩৫.০০ ১০,০০০+ ১৫
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৪ ৪২.০০ ৭৫,০০০+ ১০

উৎস: গণমাধ্যম বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিবেদন, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (প্রক্ষেপিত তথ্য)

সুপারিশ

  • `নির্বাচন কমিশন আইন, ২০০৯`-এর বিদ্যমান ধারাগুলোতে সুনির্দিষ্ট সংশোধনী এনে নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করা উচিত, যাতে তারা নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে এবং নির্বাচনী অনিয়ম তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। এর জন্য বিশেষ করে কমিশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি, এবং এর বাস্তবায়নে `আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়`-কে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
  • রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে `গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২` (RPO)-এর অধীনে একটি কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত। এই আইনে দলের সকল আয় ও ব্যয়ের উৎস ও বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং `দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)`-কে এই তথ্য যাচাই ও অনিয়ম তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে কালো টাকার প্রভাব রোধ করা যায় এবং রাজনৈতিক অর্থায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
  • নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় `বিচার বিভাগ`-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। `আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়` এর উদ্যোগে বিশেষ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে, যা `ফৌজদারি কার্যবিধি` এবং `দেওয়ানি কার্যবিধি`-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে নির্বাচনী সংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করবে, এবং এর মাধ্যমে নির্বাচনী অনিয়মের শিকার ব্যক্তিরা দ্রুত ন্যায়বিচার পাবে ও বিচার প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা ফিরে আসবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator