বিনিয়োগবান্ধব করনীতি: বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ বনাম দেশীয় রাজস্বের ক্ষয়ক্ষতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিনিয়োগবান্ধব করনীতি: বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ বনাম দেশীয় রাজস্বের ক্ষয়ক্ষতি

নাসরিন সুলতানা  avatar   
নাসরিন সুলতানা
বিনিয়োগবান্ধব করনীতি: বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ বনাম দেশীয় রাজস্বের ক্ষয়ক্ষতি
বিনিয়োগবান্ধব করনীতি: বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ বনাম দেশীয় রাজস্বের ক্ষয়ক্ষতি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক ঘোষিত নতুন আর্থিক বছরের বাজেট প্রস্তাবনায় বেশ কিছু বিনিয়োগবান্ধব কর ছাড় ও শুল্ক সুবিধা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিশে...

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক ঘোষিত নতুন আর্থিক বছরের বাজেট প্রস্তাবনায় বেশ কিছু বিনিয়োগবান্ধব কর ছাড় ও শুল্ক সুবিধা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিশেষত, ১০০% রপ্তানিমুখী শিল্প এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে (Economic Zones) নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর্পোরেট কর হার হ্রাস এবং কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী কর অবকাশের প্রস্তাবনা অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের রাজস্ব আদায় এবং দেশীয় শিল্প সুরক্ষার উপর এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে NBR-এর এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রায়শই তাদের নীতি প্রণয়নে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের উপর জোর দিয়ে থাকে, যা বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে। উন্নত অবকাঠামো, সস্তা শ্রম এবং ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি যদি আকর্ষণীয় কর সুবিধা প্রদান করা হয়, তবে তা বহুদেশীয় কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন প্রযুক্তির আগমন এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রনিক্স বা উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর্পোরেট কর হার ৩৫% থেকে কমিয়ে ২০% বা তারও নিচে নামিয়ে আনার প্রস্তাবনা এসব শিল্পে FDI প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক অনুমোদিত কোনো বিশেষ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এমন সুবিধা শেয়ারবাজারের মাধ্যমে পুঁজি আহরণে সহায়তা করতে পারে।

তবে, এই বিনিয়োগবান্ধব করনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর মাধ্যমে দেশীয় রাজস্বের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সতর্ক করে আসছে যে, ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী কর ছাড়ের ফলে NBR-এর রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে, যা সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে। বিশেষ করে, যখন দেশীয় কোম্পানিগুলো তাদের স্বাভাবিক কর কাঠামোতে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তখন বিদেশি কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করলে একটি অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এর ফলে, দেশীয় শিল্পগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া, কিছু অসাধু বিদেশি বিনিয়োগকারী কর সুবিধা ব্যবহার করে 'প্রফিট রিপ্যাট্রিয়েশন' (মুনাফা ফেরত নেওয়া) বা 'ট্যাক্স ইরোশন' (কর ফাঁকি) এর মতো কৌশল অবলম্বন করতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর তথ্যানুযায়ী, যদিও রপ্তানিমুখী বিদেশি বিনিয়োগ সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক, তবে এর জন্য প্রদত্ত কর ছাড়ের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অর্থবছর মোট প্রত্যক্ষ কর আদায় (কোটি টাকা) FDI প্রবাহ (মিলিয়ন USD) NBR প্রদত্ত কর ছাড়ের আনুমানিক মূল্য (কোটি টাকা)
২০১৮-১৯ ৮০,৭০০ ৩,৬১৫ ৪,২০০
২০১৯-২০ ৮৬,২০০ ২,৫৯৬ ৫,০০০
২০২০-২১ ৯২,৬০০ ২,৫০৭ ৬,২০০
২০২১-২২ ১,০৩,৪০০ ৩,৪৪০ ৭,৫০০
২০২২-২৩ (প্রাক্কলিত) ১,১৪,৫০০ ৩,২০০ ৮,৮০০

উৎস: NBR বার্ষিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও CPD বিশ্লেষণ

সুপারিশ

  • NBR কর্তৃক প্রদত্ত কর সুবিধাগুলো শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট, উচ্চ-প্রযুক্তি নির্ভর এবং রপ্তানিমুখী খাতের জন্য সীমাবদ্ধ করা উচিত, যেখানে কঠোর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্তাবলী সংযুক্ত থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এই খাতগুলো চিহ্নিতকরণে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং প্রতিটি সুবিধার জন্য একটি নির্দিষ্ট 'সূর্যাস্ত ধারা' (Sunset Clause) নির্ধারণ করতে হবে, যাতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর সুবিধাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
  • দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সুষম ও ন্যায়সঙ্গত কর কাঠামো প্রণয়নে NBR এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। BSEC-এর মাধ্যমে দেশীয় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে, যা দেশীয় পুঁজি গঠন ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং বিদেশি বিনিয়োগের সাথে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে একটি সমতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
  • NBR-এর কর প্রশাসনকে আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে কর ফাঁকি রোধ হয় এবং করের ভিত্তি প্রসারিত হয়। CPD-এর সুপারিশ অনুযায়ী, NBR-এর উচিত নিয়মিতভাবে প্রদত্ত কর ছাড়ের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব, যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের উপর একটি স্বাধীন ও বিস্তারিত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা, যা জনসমক্ষে উন্মুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন সুলতানা

নাসরিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator