অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সাবরিনা চৌধুরী  avatar   
সাবরিনা চৌধুরী
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, কিন্তু এর মধ্যে বৈশ্বিক স্কলারশিপ নিয়ে সফলভাবে উচ্চশিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীর হার তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর লক্ষাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করেন, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজস্ব অর্থায়নে যাত্রা শুরু করে। তবে, ইউজিসি (University Grants Commission) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংস্থার পর্যবেক্ষণ বলছে, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান বৈশ্বিক স্কলারশিপগুলোর পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রস্তুতিমূলক সহায়তার অভাবে সিংহভাগ আবেদনকারী ব্যর্থ হচ্ছেন। বিশেষত, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক গবেষণা ও দক্ষতাভিত্তিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির হার এখনো পিছিয়ে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার আন্তর্জাতিকীকরণে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি কেবল ব্যক্তিগত স্বপ্ন ভঙ্গের কারণই নয়, দেশের অর্থনৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে।

উচ্চশিক্ষার এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো বিদ্যমান পাঠ্যক্রমের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান ও চাহিদার মৌলিক ফারাক। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, এখনো এমন একটি পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয় যা মূলত তত্ত্বীয় জ্ঞাননির্ভর এবং গবেষণা-ভিত্তিক উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণাত্মক ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয় না। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের প্রায়শই উচ্চমানের গবেষণা প্রস্তাবনা (Research Proposal) এবং একাডেমিক লেখার দক্ষতা (Academic Writing Skill) প্রদর্শনের প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে খুব কমই অন্তর্ভুক্ত। ইউজিসি যদিও পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন গতি অত্যন্ত ধীর এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল আনছে না। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি স্তরের আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়াও, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার জন্য অপরিহার্য হলেও, দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদান পদ্ধতির অভাব স্পষ্ট, যা শিক্ষার্থীদের আইইএলটিএস বা টোফেল-এর মতো পরীক্ষাগুলোতে প্রত্যাশিত স্কোর অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।

দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সংযোগের অভাবও এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর দেশের কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করলেও, তাদের কার্যক্রম মূলত স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ। উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ প্রায়শই নির্দিষ্ট কিছু উচ্চ-দক্ষতা সম্পন্ন গবেষণা ক্ষেত্র বা উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গভীর জ্ঞান বা গবেষণার পূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে খুব কমই বের হতে পারে। BANBEIS (Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics)-এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা খুবই কম, এবং যারা যান, তাদের অধিকাংশই প্রযুক্তিগত বা ফলিত বিজ্ঞানের স্কলারশিপের পরিবর্তে সাধারণ ডিগ্রি অর্জনের চেষ্টা করেন। এই পরিস্থিতি উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ সরবরাহে বাংলাদেশের ভূমিকা সীমিত করে দেয়। এর পাশাপাশি, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগীতা প্রকল্প এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কিং সুযোগের অভাবও বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনার বা যৌথ গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক গবেষণার ধারা এবং স্কলারশিপের সুযোগ সম্পর্কে অবগত হতে পারেন না।

তথ্য প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অভাবও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাঝে মাঝে কিছু স্কলারশিপ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও, তা একটি সুসংগঠিত এবং কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হয় না। বিভিন্ন দেশের সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় বা ফাউন্ডেশন প্রদত্ত হাজার হাজার স্কলারশিপের তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, যা একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর পক্ষে খুঁজে বের করা এবং সেগুলোর জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময়, স্কলারশিপের আবেদনের শেষ তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা সে সম্পর্কে জানতে পারেন। এছাড়াও, আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আবেদনপত্র সাজানোর বিষয়ে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনার অভাবও শিক্ষার্থীদের হতাশ করে। একটি জাতীয় পর্যায়ে স্কলারশিপ তথ্য কেন্দ্র বা গাইডেন্স প্ল্যাটফর্মের অনুপস্থিতি এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি সমন্বিত 'গ্লোবাল স্কলারশিপ অ্যাকশন প্ল্যান' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলে এই সমস্যা বহুলাংশে সমাধান করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর পরিকল্পনা দেখা যায়নি, যা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে পারে এবং দেশের জন্য জ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদ তৈরিতে অবদান রাখতে পারে।

বছর স্নাতক ডিগ্রিধারী (আনুমানিক) বৈশ্বিক স্কলারশিপের জন্য আবেদনকারী (আনুমানিক) বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তি (আনুমানিক) উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গমন (নিজস্ব অর্থায়নসহ, আনুমানিক)
২০১৯ ৫,৫০,০০০ ১৫,০০০ ১,২০০ ১০,০০০
২০২০ ৫,৮০,০০০ ১৬,৫০০ ১,৩৫০ ১১,৫০০
২০২১ ৬,১০,০০০ ১৮,০০০ ১,৫০০ ১৩,০০০
২০২২ ৬,৩০,০০০ ২০,০০০ ১,৭০০ ১৪,৫০০
২০২৩ ৬,৫০,০০০ ২২,০০০ ১,৯০০ ১৬,০০০

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, BANBEIS এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা ফোরামের সমন্বিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে আনুমানিক হিসাব।

সুপারিশ

  • ইউজিসি (University Grants Commission) কর্তৃক ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাঠ্যক্রম বাধ্যতামূলক করা হোক, যেখানে গবেষণা পদ্ধতি, একাডেমিক লেখালেখি এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। এই পাঠ্যক্রম Bologna Process বা অনুরূপ বৈশ্বিক শিক্ষামানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে এবং এর বাস্তবায়ন তদারকির জন্য ইউজিসিকে একটি নিয়মিত নিরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়, NSDA (National Skills Development Authority) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ২০২৬ সালের মধ্যে একটি 'গ্লোবাল স্কিলস পাথওয়ে প্রোগ্রাম' চালু করবে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় সুনির্দিষ্ট দক্ষতা চিহ্নিত করা হবে (যেমন - ডেটা অ্যানালিটিক্স, অ্যাডভান্সড ল্যাব টেকনিক, গবেষণা সফটওয়্যার জ্ঞান) এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হবে যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়, BANBEIS (Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics)-এর তত্ত্বাবধানে ২০২৪ সালের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয়, ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করবে, যেখানে সকল বৈশ্বিক স্কলারশিপের তথ্য, আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা সুসংগঠিতভাবে পাওয়া যাবে। একই সাথে, ইউজিসিকে নির্দেশ দিতে হবে যেন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব 'আন্তর্জাতিক অফিস' স্থাপন করে, যা স্কলারশিপ আবেদন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের সরাসরি সহায়তা এবং সফল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে মেন্টরশিপের সুযোগ তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাবরিনা চৌধুরী

সাবরিনা চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator