পারমাণবিক শক্তি ও রূপপুর প্রকল্প খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পারমাণবিক শক্তি ও রূপপুর প্রকল্প খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার

ড. তানভীর হাসান  avatar   
ড. তানভীর হাসান
পারমাণবিক শক্তি ও রূপপুর প্রকল্প খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
পারমাণবিক শক্তি ও রূপপুর প্রকল্প খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার সময়সীমা ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুনঃনির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে বিজ্ঞান ও...

সম্প্রতি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার সময়সীমা ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুনঃনির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এটি, প্রকল্পের প্রাথমিক সময়সীমা ২০২৩ সাল থেকে দুই দফা পেছানোর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত এবং দেশের বৃহত্তম একক অবকাঠামো প্রকল্পে চলমান চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, এবং কারিগরি জটিলতার এক সম্মিলিত প্রভাবে রূপপুর প্রকল্প এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, যা দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই পরিবর্তনের ঢেউ কেবল প্রকল্পের সময়সীমা বা ব্যয়কেই প্রভাবিত করছে না, বরং পারমাণবিক শক্তি খাতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের এই পরিবর্তনের মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার উপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলি প্রকল্পের সরঞ্জাম আমদানি, অর্থায়ন প্রক্রিয়া এবং কারিগরি সহায়তা সরবরাহে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। রাশিয়ান ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থার সন্ধান এবং জটিল আন্তর্জাতিক লেনদেন পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর ফলে, প্রকল্পের নির্মাণ সামগ্রী ও যন্ত্রাংশ পরিবহনে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দিয়েছে, যা সরাসরি প্রকল্পের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলছে। উপরন্তু, পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবহৃত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বাস্তবায়নও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে নতুন করে আলোচনার টেবিলে এসেছে, যেখানে একটি স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ চেইন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে নতুন সমাধান খুঁজে বের করতে হচ্ছে, যা প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় এবং সময়সীমার উপর চাপ সৃষ্টি করছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব ততটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়নি, যা এখন একটি বড় শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনগুলির সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের উপর সুস্পষ্ট। প্রকল্পের বিলম্বিত বাস্তবায়ন কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সময়কেই পিছিয়ে দিচ্ছে না, বরং প্রকল্পের মোট ব্যয় বৃদ্ধি করছে। প্রাথমিক প্রাক্কলন থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত, বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের বাজেট কয়েক দফায় সংশোধিত হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ সরকারকে এই বৃহৎ প্রকল্পের জন্য বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি বর্ধিত ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিলম্ব হওয়ায় দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে অন্যান্য, বিশেষত জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। World Bank এবং ADB সরাসরি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন না করলেও, তারা বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে সহায়তা করে থাকে। রূপপুর প্রকল্পের কারণে সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা পরোক্ষভাবে এই উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য জ্বালানি প্রকল্প নিয়ে আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশের আর্থিক সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা মূল্যায়িত হয়। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন।

প্রকল্পের কারিগরি জটিলতা এবং স্থানীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও এই পরিবর্তনের ঢেউয়ের অন্যতম কারণ। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উচ্চ প্রশিক্ষিত জনবল এবং বিশেষায়িত কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন। প্রকল্প শুরুর পর থেকে এই খাতে স্থানীয় জনবলের দক্ষতা উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হলেও, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক বিশেষজ্ঞ তৈরি করা একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি (Spent Nuclear Fuel) নিরাপদভাবে সংরক্ষণ বা তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনগত কাঠামোর অধীনে কাজ করা অপরিহার্য। যদিও রাশিয়ার সাথে ব্যবহৃত জ্বালানি ফেরত নেওয়ার প্রাথমিক চুক্তি রয়েছে, এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিয়ে এখনও বিশদ আলোচনার প্রয়োজন। উপরন্তু, পারমাণবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) এর ক্ষমতা ও স্বাধীনতা আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। এই সংস্থাটিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এর নির্দেশিকা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি এবং আইনি ক্ষমতা প্রদান করা অপরিহার্য। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশেষত ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণেও কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, যা প্রকল্পের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সফলভাবে সংযুক্ত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব চ্যালেঞ্জের সমন্বিত প্রভাব রূপপুর প্রকল্পকে তার নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করেছে এবং এর ব্যবস্থাপনায় এক নতুন পদ্ধতির দাবি জানাচ্ছে।

বিবরণ প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা (২০১৩-১৪) বর্তমান অবস্থা/সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা (২০২৩-২৪)
প্রকল্পের মোট ব্যয় (আনুমানিক) $12.65 বিলিয়ন $12.65 বিলিয়ন (রাশিয়ান ঋণ $11.38 বিলিয়ন)
ইউনিট ১ বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৩ ২০২৫ (সংশোধিত)
ইউনিট ২ বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৪ ২০২৬ (সংশোধিত)
মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট (২x১২০০ মেগাওয়াট) ২৪০০ মেগাওয়াট (২x১২০০ মেগাওয়াট)
ইউনিট ১ এর ভৌত অগ্রগতি ৬০% (২০১৮) ৯২% এর বেশি (২০২৩)
ইউনিট ২ এর ভৌত অগ্রগতি ৩০% (২০১৮) ৭০% এর বেশি (২০২৩)
রাশিয়ান ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধ ২০২৭ ২০২৭ (অপরিবর্তিত, তবে পরিশোধ পদ্ধতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ)

উৎস: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য ও প্রতিবেদন)।

সুপারিশ

  • প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা ব্যবস্থাপনার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের 'প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকি কমিটি' গঠন করা হোক। এই কমিটি Public Procurement Act, 2006 এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপের আর্থিক স্বচ্ছতা ও সময়সীমা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং যেকোনো বিচ্যুতিতে দ্রুত সংশোধনীমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে, রাশিয়ান ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য বিকল্প অর্থায়ন কৌশল এবং মুদ্রা বিনিময়ের একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
  • পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির পাশাপাশি একটি বিস্তারিত ও দীর্ঘমেয়াদী 'জাতীয় পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি' প্রণয়ন করা হোক, যা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এই নীতিতে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি নিরাপদে সংরক্ষণ, পরিবহন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও IAEA এর নির্দেশিকা মেনে চলার সুস্পষ্ট বিধান থাকবে। প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্যতা যাচাই করে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে।
  • রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় ৪০০ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন এবং সাবস্টেশনগুলির নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে একটি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার তার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ADP) এই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিত করবে এবং পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান (PSMP) অনুযায়ী গ্রিড স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শের জন্য ADB বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তানভীর হাসান

ড. তানভীর হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পারমাণবিক শক্তি ও রূপপুর প্রকল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator