বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে মহাপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে, সেখানে দেশের শিল্পখাতগুলোর মধ্যে জাহাজ নির...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে মহাপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে, সেখানে দেশের শিল্পখাতগুলোর মধ্যে জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভূমিকা এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের সর্বশেষ অর্থনৈতিক পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বার্ষিক রপ্তানি আয় বর্তমানে প্রায় ৫০-৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ০.১% এরও কম। এই পরিসংখ্যান সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাময় খাতের প্রকৃত সক্ষমতা এখনও অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে এবং এর বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প, বিশেষত ছোট ও মাঝারি আকারের জাহাজ নির্মাণে, গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। স্থানীয় নদীপথ ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য কার্গো ভেসেল, ফেরি, টাগবোট এবং মাছ ধরার ট্রলার নির্মাণে দেশীয় শিপইয়ার্ডগুলো নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। যেমন, আনন্দ শিপইয়ার্ড ও ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপ ও আফ্রিকার বাজারে ছোট পরিসরে কিছু জাহাজ রপ্তানি করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। তবে, এই রপ্তানির পরিমাণ বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ বাজারের তুলনায় যৎসামান্য। বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের অভাব এই শিল্পের প্রসারে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অনেক সময়ই, বাংলাদেশের শিপইয়ার্ডগুলোকে উচ্চমানের ইস্পাত ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির উপর নির্ভর করতে হয়, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, এই খাতের উন্নয়নে নীতিগত সহায়তা দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাবে তা পূর্ণাঙ্গ সফলতা পাচ্ছে না।

অন্যদিকে, জাহাজ ভাঙা শিল্প দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ ভাঙা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন স্ক্র্যাপ মেটাল পুনর্ব্যবহার করে দেশের স্টিল মিলগুলোর প্রায় ৬০-৭০% চাহিদা পূরণ করে। এটি একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে চলেছে, অন্যদিকে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণেও সহায়তা করছে। তবে, এই শিল্পের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে – তা হলো পরিবেশ দূষণ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে এখনও পর্যন্ত নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াকরণের অভাব প্রকট। বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ, যেমন অ্যাসবেস্টস, পিএসবি (Polychlorinated biphenyls) এবং ভারী ধাতুগুলো প্রায়শই অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশ ও সাগরে মিশে যাচ্ছে। 'হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস, ২০০৯' এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যদিও বাংলাদেশ সরকার 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনর্ব্যবহার আইন, ২০১৮' প্রণয়ন করেছে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে বিনিয়োগের অভাব এই শিল্পের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এই খাতের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশগত সুরক্ষা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
মোট জাহাজ ভাঙা টন (লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টন) ২.৯ মিলিয়ন ৩.১ মিলিয়ন ২.৫ মিলিয়ন ২.৮ মিলিয়ন ৩.৩ মিলিয়ন
পুনর্ব্যবহারকৃত ইস্পাত (মোট ইস্পাত সরবরাহে %) ৬২% ৬৪% ৫৮% ৬০% ৬৫%
জাহাজ নির্মাণ রপ্তানি আয় (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৫২ ৬১ ৪৫ ৫৬ ৬৮
হংকং কনভেনশন অনুবর্তী ইয়ার্ড (%) ৫% ৬% ৭% ৮% ১০%

উৎস: বাংলাদেশ জাহাজ ভাঙা শিল্প সমিতি (BSBRA), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, World Bank ও ADB প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে শিল্প মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে, 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনর্ব্যবহার আইন, ২০১৮' এর অধীনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যার মূল কাজ হবে পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই টাস্কফোর্সকে World Bank-এর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তায় একটি 'গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ইয়ার্ডগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করবে।
  • জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশের জন্য, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'জাতীয় শিল্পনীতি'র অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট 'শিপবিল্ডিং ইনসেনটিভ প্যাকেজ' ঘোষণা করা উচিত। এই প্যাকেজে স্থানীয় শিপইয়ার্ডগুলোকে নতুন প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং উন্নতমানের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করতে হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি 'টেকনোলজি আপগ্রেডেশন ফান্ড' তৈরি করা যেতে পারে, যা স্থানীয় শিপইয়ার্ডগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ নির্মাণে সক্ষম করে তুলবে।
  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে 'হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস, ২০০৯' এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে সকল জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সনদপ্রাপ্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) এবং World Bank-এর কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করে কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator