এনবিআর ও ভ্যাট অটোমেশন: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এনবিআর ও ভ্যাট অটোমেশন: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক

নাসরিন সুলতানা  avatar   
নাসরিন সুলতানা
এনবিআর ও ভ্যাট অটোমেশন: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক
এনবিআর ও ভ্যাট অটোমেশন: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় ই-এফডিআর (Electronic Fiscal Device Registration) স্থাপন এবং ই-রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সহজীকর...

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় ই-এফডিআর (Electronic Fiscal Device Registration) স্থাপন এবং ই-রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সহজীকরণের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন গতিপ্রকৃতি নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ প্রকাশিত NBR-এর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে সারাদেশে ১ লক্ষ ই-এফডিআর স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ৩৩,০০০ ডিভাইস স্থাপন সম্ভব হয়েছে, যা প্রত্যাশিত অগ্রগতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় না, বরং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা আনার বৃহৎ স্বপ্নের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার ফারাককেও স্পষ্ট করে তোলে।

ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্পের মূল প্রত্যাশা ছিল রাজস্ব সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন করা, কর ফাঁকি রোধ করা, এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি সহজ ও স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করা। NBR এর প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ধাপে ধাপে সকল ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে ই-এফডিআর স্থাপন করা এবং ই-পেমেন্ট ও ই-রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে করদাতাদের ভোগান্তি কমানো। এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল, তেমনি অন্যদিকে করদাতাদের জন্য কমপ্লায়েন্স খরচ কমা এবং ব্যবসা পরিচালনায় স্বাচ্ছন্দ্য আসার কথা ছিল। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট ও রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সরল হলে তারা আরও সহজে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারতেন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হতো। সরকারের 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশনের সাথে সঙ্গতি রেখে, এই অটোমেশনকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, যা দেশের কর সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হয়েছিল।

তবে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে NBR কে একাধিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা প্রত্যাশিত গতির সাথে মেলেনি। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর দুর্বলতা, বিশেষ করে ইন্টারনেট সংযোগের অপ্রাপ্যতা এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ই-এফডিআর স্থাপন ও নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনায় বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অনেক ব্যবসায়ী, বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, নতুন প্রযুক্তির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছেন না, যা প্রশিক্ষণের অভাব এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার দুর্বলতা নির্দেশ করে। এছাড়া, NBR এর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই নতুন সিস্টেম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভ্যাট অটোমেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে, যা কর ফাঁকির সুযোগ কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি করার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। একইসাথে, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর সাথে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকরা প্রায়শই ভ্যাট রিফান্ড পেতে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ করেন, যা অটোমেশনের মাধ্যমে সহজ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'ইজ অব ডুয়িং বিজনেস' সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নে NBR এর এই অটোমেশন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও, বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে এর সুফল এখনো অধরা রয়ে গেছে।

ই-পেমেন্ট এবং ই-রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। NBR এর লক্ষ্য ছিল ৯০% ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে ই-রিটার্ন দাখিলের আওতায় আনা, কিন্তু বর্তমান হার প্রায় ৫০%-এর আশেপাশে। অনেক ব্যবসায়ী এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যা পুরাতন অভ্যাস এবং নতুন সিস্টেমে আস্থার অভাবের ফল। এছাড়াও, ভ্যাট সফটওয়্যারে ত্রুটি, সার্ভার ধীরগতি এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব ইন্টারফেসের অভাবও করদাতাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এই সমস্যাগুলো NBR এর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে প্রভাবিত করছে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

সূচক NBR এর লক্ষ্যমাত্রা (২০২২-২৩ অর্থবছর) বাস্তব অর্জন (২০২২-২৩ অর্থবছর) অর্জন হার (%)
ই-এফডিআর স্থাপন (ইউনিট) ১,০০,০০০ ৩৩,০০০ ৩৩%
ই-রিটার্ন দাখিল হার (%) ৯০% ৫০% ৫৫.৫৬%
মোট ভ্যাট রাজস্ব বৃদ্ধি (%) ১৫% ১০.৫% ৭০%

উৎস: NBR এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (২০২৩), CPD এর বিশ্লেষণ

সুপারিশ

  • NBR কে তার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য ভ্যাট অটোমেশন সিস্টেমের ওপর বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করতে হবে, বিশেষ করে 'ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২' এর ডিজিটাল প্রয়োগ এবং ই-এফডিআর ও ই-পেমেন্ট সংক্রান্ত কারিগরি জ্ঞান বৃদ্ধিতে। এই প্রশিক্ষণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে পরিচালিত হতে পারে যাতে ব্যবসায়ীদের চাহিদা সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়।
  • করদাতাদের মধ্যে ই-এফডিআর স্থাপন এবং ই-রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করার জন্য NBR কে সুনির্দিষ্ট আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যেমন— নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ই-পেমেন্ট ও ই-রিটার্ন দাখিলকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়া অথবা অডিট প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার। এটি ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
  • ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় নিশ্চিত করতে NBR, অর্থ মন্ত্রণালয়, এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা আবশ্যক। এই কমিটি নিয়মিতভাবে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে, প্রযুক্তিগত বাধা চিহ্নিত করবে এবং EPB এর সাথে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকদের ভ্যাট রিফান্ড সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন সুলতানা

নাসরিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator