কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) ও বাংলাদেশ: ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) ও বাংলাদেশ: ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ

সাজিদ মাহমুদ  avatar   
সাজিদ মাহমুদ
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) ও বাংলাদেশ: ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) ও বাংলাদেশ: ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) প্রবর্তনের সম্ভাব্যতা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) প্রবর্তনের সম্ভাব্যতা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা স্থান পেয়েছে। এই পদক্ষেপ কেবল দেশের আর্থিক খাতের আধুনিকীকরণের ইঙ্গিত দেয় না, বরং ডিজিটাল লেনদেনের ক্রমবর্ধমান বিস্তার এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির বৈশ্বিক অগ্রগতির মুখে বাংলাদেশের একটি কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাকেও তুলে ধরে। এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বিশ্বজুড়ে ৯০ শতাংশেরও বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক CBDC নিয়ে গবেষণা, পাইলট প্রকল্প বা বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে, যা ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) প্রবর্তনের পেছনে বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করা। দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে, যেখানে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (MFS) একটি বড় ভূমিকা পালন করলেও, CBDC তাদের জন্য আরও নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত একটি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রদান করতে পারে। ব্লকচেইন প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি CBDC ব্যবস্থা লেনদেনের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, যা জালিয়াতি ও অর্থ পাচার রোধে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের খরচ ও সময় কমানো। বর্তমানে, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স প্রেরণে উচ্চ ফি এবং দীর্ঘ সময় লাগে, যা প্রবাসীদের জন্য একটি বড় সমস্যা। একটি ব্লকচেইন-ভিত্তিক CBDC প্ল্যাটফর্ম এই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর, সাশ্রয়ী এবং আরও দক্ষ করে তুলতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও উদ্দীপিত করবে। এটি কেবল ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যেখানে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে লেনদেন স্বয়ংক্রিয় ও শর্তসাপেক্ষ করা সম্ভব হবে।

তবে, CBDC-এর সফল বাস্তবায়ন কেবল আর্থিক দিক নয়, বরং শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তা প্রস্তুতির উপরও নির্ভরশীল। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এর তত্ত্বাবধানে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এবং 5G প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, CBDC লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ-গতির এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে পারে। একই সাথে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA)-এর মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং ব্লকচেইন ডেভেলপারদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। একটি ব্লকচেইন-ভিত্তিক CBDC সিস্টেমে ডেটা গোপনীয়তা, স্কেলেবিলিটি এবং আন্তঃঅপারাবিলিটি (অন্যান্য পেমেন্ট সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত হওয়ার ক্ষমতা) চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলা করার জন্য স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) দল গঠন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সদস্যরা এই প্রযুক্তির স্থানীয়করণ এবং এর উপর ভিত্তি করে নতুন ওয়েব৩ অ্যাপ্লিকেশন তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যা দেশের ডিজিটাল উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেমকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

CBDC-এর কার্যকারিতা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই বিভিন্ন পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত ডেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এই ডেটা উপাত্তের মধ্যে থাকতে পারে ব্যবহারকারীর আচরণ, লেনদেনের পরিমাণ ও গতি, সাইবার আক্রমণের প্রবণতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার উপর এর প্রভাব। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের মাধ্যমে সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে CBDC-এর জন্য একটি robust ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে। এই ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে CBDC-এর ডিজাইন, বৈশিষ্ট্য এবং প্রচলন কৌশল সম্পর্কে তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোন অঞ্চলে বা কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে CBDC-এর গ্রহণযোগ্যতা বেশি, কোন ধরনের লেনদেনের জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর হবে, এবং কীভাবে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা যায়—এই সব প্রশ্নের উত্তর ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সাথে সংহত একটি ডিজিটাল বিপ্লব, যার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ডেটা-ভিত্তিক পুনরাবৃত্তিমূলক উন্নয়ন।

সূচক ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত) ভূমিকা
মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) গ্রাহক (কোটি) ১৭.৫ ১৯.২ CBDC-এর সম্ভাব্য ব্যবহারকারী ভিত্তি
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ১২.৯ ১৩.৯ ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামোগত ভিত্তি (BTRC)
ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ (ট্রিলিয়ন টাকা) ১০.২ ১২.৫ CBDC-এর সম্ভাব্য লেনদেনের বাজার
ব্লকচেইন ডেভেলপার ও স্টার্টআপ (BASIS সদস্য) ১৫০+ ২০০+ স্থানীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ (কোটি টাকা) ১০০০+ ১২০০+ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও অবকাঠামো (BHTPA)

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, BTRC, ICT Division, BASIS, BHTPA এর বিভিন্ন প্রকাশনা ও বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে প্রাক্কলন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এর সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করে ব্লকচেইন-ভিত্তিক CBDC-এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো (যেমন, ডিজিটাল সম্পদ আইন, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট বৈধকরণ) প্রণয়ন করতে হবে, যা ওয়েব৩ ইকোসিস্টেমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও 5G নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে অগ্রাধিকার দেবে এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) BASIS-এর সহযোগিতায় ব্লকচেইন ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করবে, যাতে CBDC বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের কারিগরি সহায়তায়, একটি নিয়ন্ত্রিত স্যান্ডবক্স পরিবেশে (যেমন, সরকারি ভাতা বিতরণ বা আন্তঃব্যাংক লেনদেন) CBDC-এর পাইলট প্রকল্প চালু করবে, যা থেকে প্রাপ্ত বাস্তব ডেটা বিশ্লেষণ করে এর ডিজাইন, নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব সম্পর্কে তথ্য-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাজিদ মাহমুদ

সাজিদ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator