নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

রেহানা আক্তার  avatar   
রেহানা আক্তার
নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

২০২২ সালের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয় কেবল একটি ট্রফি জয় ছিল না, এটি ছিল দেশের নারী ক্রীড়াবিদদের সুপ্ত সম্ভাবনা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সাফল্য আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পর্যাপ্ত কাঠামোগত সুবিধা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ পেলে বাংলাদেশের নারীরা বিশ্ব মঞ্চেও নিজেদের প্রমাণ করতে সক্ষম। এই সাফল্য এসেছে সীমিত সংখ্যক প্রশিক্ষক, অপ্রতুল প্রশিক্ষণ মাঠ এবং প্রায়শই লিঙ্গ-সংবেদনশীল সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকা সত্ত্বেও, যা দেশের ক্রীড়া অবকাঠামোতে বিদ্যমান বিশাল ঘাটতিকেই প্রকট করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ-এর মাধ্যমে সরকার কর্তৃক পরিচালিত বর্তমান বিনিয়োগের কার্যকারিতা, ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ক্ষেত্র এবং বিপুল সম্ভাবনার সঠিক পরিমাপ অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য কাঠামোগত সুবিধার বর্তমান চিত্রটি মিশ্র। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু জেলায় ক্রীড়া কমপ্লেক্স এবং একাডেমি নির্মাণে বিনিয়োগ হয়েছে, তবে এগুলোর বেশিরভাগই পুরুষ ক্রীড়াবিদদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য পৃথক ড্রেসিং রুম, নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের জন্য উপযুক্ত মাঠের সংখ্যা এখনো অপ্রতুল। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল পর্যায়ে, যেখানে অধিকাংশ প্রতিভা লুকিয়ে আছে, সেখানে মৌলিক ক্রীড়া অবকাঠামোর অভাব একটি বড় বাধা। প্রায়শই দেখা যায়, নারী ক্রীড়াবিদরা পুরুষদের সাথে একই সুবিধা ভাগ করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং অনুশীলনের মানকে প্রভাবিত করছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেছে, যেখানে অবকাঠামোগত সুবিধা একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP)-তে ক্রীড়া খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও, নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য নির্দিষ্ট ও লিঙ্গ-সংবেদনশীল অবকাঠামো নির্মাণে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য পর্যাপ্ত কাঠামোগত সুবিধা ও বিনিয়োগের অভাবে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় অনেক প্রতিশ্রুতিশীল নারী ক্রীড়াবিদ খেলাধুলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে মেধাশূন্য করছে। সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার অভাব এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দ্বিতীয়ত, নিম্নমানের প্রশিক্ষণ সুবিধা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকে সীমাবদ্ধ করছে। খেলোয়াড়দের উন্নত প্রশিক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য অত্যাধুনিক জিমনেশিয়াম, সুইমিং পুল, ইনডোর প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড এবং স্পোর্টস সায়েন্স ল্যাবের মতো সুবিধাগুলোর অনুপস্থিতি তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) অবকাঠামো উন্নয়নে লিঙ্গ সমতার উপর জোর দেয়, যেখানে নারীদের জন্য নিরাপদ ও প্রবেশযোগ্য সুবিধা নিশ্চিত করাকে টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এই দিকটিতে দুর্বলতা জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০১৩-এর লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিনিয়োগের অভাব কেবল ক্রীড়া ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি নারীর সামগ্রিক সামাজিক অবস্থান, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি বড় ঝুঁকি।

তবে, এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যেও নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধায় বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা বিদ্যমান। সঠিক বিনিয়োগ কেবল আন্তর্জাতিক সাফল্যই আনবে না, বরং এটি নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক সংহতি এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উন্নত ক্রীড়া অবকাঠামো গ্রামীণ মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং বাল্যবিবাহ ও অন্যান্য সামাজিক কুপ্রথা থেকে রক্ষা করবে। বাংলাদেশ সরকার যদি তার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য সুনির্দিষ্ট অবকাঠামোগত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, তবে এই খাতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি করে অত্যাধুনিক নারী ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, যেখানে আবাসিক সুবিধা, চিকিৎসা সেবা এবং মানসম্মত কোচিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে, তা জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। ক্রীড়া অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, যেমন ক্রীড়া সরঞ্জাম উৎপাদন, ক্রীড়া পর্যটন এবং ক্রীড়া ইভেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

সূচক ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর
ক্রীড়া অবকাঠামোতে মোট সরকারি বরাদ্দ (কোটি টাকা) ৮৫০ ৯২০ ৯৮৫
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো বরাদ্দ (কোটি টাকা) ৬০ ৭৫ ৮৮
নারী ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ও আবাসিক কেন্দ্র সংখ্যা (জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়) ৯ ১১ ১৩
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক/এডিবি'র ক্রীড়া উন্নয়ন সহায়তা (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৫.৫ ৬.২ ৭.০
সংগঠিত ক্রীড়ায় নারী অংশগ্রহণকারীর হার (১৮-২৫ বছর) ৯.৮% ১০.৫% ১১.২%

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার; জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অবিলম্বে জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০১৩ সংশোধন করে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য সুনির্দিষ্ট, লিঙ্গ-সংবেদনশীল অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে একটি বাধ্যতামূলক অধ্যায় যুক্ত করুক এবং এর বাস্তবায়নে প্রতি অর্থবছরে মোট ক্রীড়া বাজেটের ন্যূনতম ২০% নারী ক্রীড়া অবকাঠামোতে বরাদ্দ নিশ্চিত করুক।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি-এর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তায়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি করে অত্যাধুনিক 'নারী ক্রীড়া একাডেমি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করুক, যেখানে আবাসিক, চিকিৎসা, পুষ্টি এবং মনো-সামাজিক সহায়তা সুবিধা থাকবে।
  • বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) তার নারী ক্রীড়াবিদ ভর্তির কোটা ২০২৫ সালের মধ্যে বর্তমানের চেয়ে ৫০% বৃদ্ধি করুক এবং উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর মাধ্যমে 'গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদ অন্বেষণ কর্মসূচি' জোরদার করে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান মেয়েদের জন্য প্রশিক্ষণের পথ সুগম করুক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা আক্তার

রেহানা আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator