বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেট ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকি জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের 'গভর্নমেন্ট ডিফেন্স ইন্টেগ্রিটি ইনডেক্স ২০২০' অনুযায়ী, বিশ্বের ৬২ শতাংশ দেশই প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং এই তালিকায় বাংলাদেশ 'ই' ক্যাটাগরিতে (সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী) স্থান পেয়েছে, যেখানে সামগ্রিক স্কোর মাত্র ২৫। এই পরিস্থিতি দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিকায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামসহ সকল সরকারি কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য জোরালো তাগিদ দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সামরিক খাতের মতো সংবেদনশীল ক্রয়ের ক্ষেত্রেও গোপনীয়তা কমিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ও আস্থার পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে। এটি কেবল সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্যই নয়, বরং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অনিয়ম রোধ করার জন্যও অপরিহার্য বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা খাতে অস্বচ্ছতার বিষয়টি নতুন নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যা। জাতীয় নিরাপত্তা-সম্পর্কিত গোপন বিষয়গুলো সম্পর্কে সংসদে যেমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয় না, তেমনি নিরাপত্তা খাতের বার্ষিক হিসাবের নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়েও কোনো বিতর্কের প্রমাণ মেলে না। এর ফলে জবাবদিহিতার সুযোগ সীমিত থাকে। ১৯৯২ সালের ৪ মে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো একটি রাডার কেনাকাটা নিয়ে মামলা করে, যেখানে অভিযোগ ছিল যে ১৯৮১ সালের মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে ১৯৮২ সালে ফ্রান্সের সিএসএফের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টিংহাউজ কোম্পানির রাডার কেনা হয়েছিল, যার ফলে সরকার ৬৪ কোটি ৪ লাখ ৪২ হাজার টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ধরনের ঘটনা সামরিক ক্রয়ে কমিশন বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার সংস্কৃতি তৈরি করে, যা শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনুৎসাহিত করতে পারে এবং সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মতে, দুর্নীতি শুধু সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশে একপ্রকার প্রথাগত দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
প্রতিরক্ষা বাজেটের বরাদ্দ এবং এর ব্যবহারেও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। টাকার অংকে নিট প্রতিরক্ষা বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও ডলারের হিসাবে তা কমেছে। বাজেটের একটি বড় অংশ, প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, সশস্ত্র বাহিনীর নিয়মিত বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয়ে চলে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন ক্যান্টনমেন্ট, আধুনিক প্রশিক্ষণ ভবন, সেনাপ্রাঙ্গণ, অডিটোরিয়াম ও স্বাস্থ্য সুবিধা স্থাপনের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও, সমরাস্ত্র কেনায় ব্যয় কমেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২২ সময়কালে বাংলাদেশের অস্ত্র আমদানি ৪৮ শতাংশ কমেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের অস্ত্র আমদানি বৃদ্ধির প্রবণতার সম্পূর্ণ বিপরীত। যদিও বাংলাদেশ 'ফোর্সেস গোল ২০৩০' বাস্তবায়নের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা অনুসরণ করছে, যার লক্ষ্য সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তর করা, তবে সীমিত উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে কোন খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আধুনিক যুদ্ধবিমান, মিসাইল, ড্রোন, রাডার এবং যুদ্ধজাহাজ কেনার জন্য ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ চেয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সামরিক বাজেট প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তর (ডিজিডিপি) বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিজিবি ও অন্যান্য আন্তঃবাহিনী সংস্থার ক্রয় কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে সম্পন্ন করে থাকে। ডিজিডিপি-র একটি অনলাইন সাপ্লায়ার এনলিস্টমেন্ট সিস্টেমও রয়েছে। তবে, এই ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছেন। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন সক্ষমতা, সাইবার ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি এবং সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ছে। সীমিত বাজেটের মধ্যেও তুলনামূলক কম ব্যয়ে ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় এসব প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই, সামরিক বাজেটকে কেবল অপচয় হিসেবে না দেখে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
সুপারিশ: বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেট খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদারকি কমিটি গঠন করা উচিত, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ থাকবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সামরিক ক্রয়ের প্রতিটি ধাপে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য। পাশাপাশি, 'ফোর্সেস গোল ২০৩০' বাস্তবায়নে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিবর্তে অত্যাধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, যা দেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আধুনিক যুদ্ধের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে।