অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

২০১৪ সালের পর থেকে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত না হওয়া আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান স্থবিরতার এক প্রকট দৃষ্টান্ত। এক দশক ধরে এই অঞ্চলের দেশগুলো একটি কার্যকর যৌথ প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হতে না পারায়, বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ধারণা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেমনি নতুন আঞ্চলিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিগুলো থেকে স্পষ্ট যে, সার্কের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশা বাড়ছে এবং বিকল্প আঞ্চলিক জোট, বিশেষ করে বিমসটেক (BIMSTEC)-এর দিকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক গতিপথের এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এই পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক বিভাজনকেই উন্মোচন করে না, বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ হাসিলের প্রচেষ্টার জটিল চিত্রও তুলে ধরে।

সার্কের এই নিষ্ক্রিয়তা মূলত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতা, বিশেষত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার কাশ্মীর ইস্যু এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত। এই চাপা উত্তেজনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও সম্মিলিত উদ্যোগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর ফলে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতিগুলো নিজেদের উন্নয়নের জন্য সার্কের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের ভূমিকা জোরদার করছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করছে। এই প্রবণতা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে ব্যস্ত।

সার্কের দুর্বলতার সুযোগে বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক) একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভুটান এবং নেপালকে নিয়ে গঠিত এই জোট বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার উপর জোর দিচ্ছে। বিমসটেক-এর আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের মতো ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও বিমসটেকের অগ্রগতি সার্কের মতো দ্রুত নয়, তবে এর কার্যক্রমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা যায়। বিশেষ করে, ভারতের 'এক্ট ইস্ট' নীতি এবং বাংলাদেশের 'লুক ইস্ট' নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বিমসটেক বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে (UN Peacekeeping) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য অবদানও তাদের বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সেনা ও পুলিশ প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর সক্রিয় বৈশ্বিকengagement এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতির পরিচায়ক। এই শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ কেবল আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে না, বরং বৈদেশিক নীতি প্রণয়নেও একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

সূচক সার্ক (SAARC) বিমসটেক (BIMSTEC) জাতিসংঘ শান্তি মিশনে দক্ষিণ এশীয় অবদান (২০২৩-২৪)
প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৮৫ ১৯৯৭ -
সদস্য সংখ্যা ৮ ৭ -
শেষ শীর্ষ সম্মেলন ২০১৪ ২০২২ (পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলন, শ্রীলঙ্কা) -
মূল উদ্দেশ্য দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা -
শীর্ষ অবদানকারী দক্ষিণ এশীয় দেশ (আনুমানিক ইউনিফর্মড কর্মী) - - বাংলাদেশ (৭,৪০০+), নেপাল (৬,৩০০+), ভারত (৫,৫০০+), পাকিস্তান (৪,৩০০+)
মোট ইউনিফর্মড কর্মী (আনুমানিক) - - ২৩,৫০০+ (২০২৩-২৪ এর হিসাব অনুযায়ী)

উৎস: সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সংস্থাসমূহ ও জাতিসংঘ শান্তি মিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে একটি নতুন 'সার্ক রিফর্মস চার্টার' প্রণয়নে উদ্যোগী হতে হবে, যা সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত নিরসনে একটি বাধ্যতামূলক বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া (Mandatory Dispute Resolution Mechanism) অন্তর্ভুক্ত করবে। এই প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার সুযোগ রাখা যেতে পারে, যাতে ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রধান সদস্যদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা পুনরায় শুরু হতে পারে।
  • বিমসটেক-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একটি 'বিমসটেক কানেক্টিভিটি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট' দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, যা সড়ক, রেল, নৌ এবং জ্বালানি খাতে আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেবে। এই চুক্তির আওতায় একটি সুনির্দিষ্ট অর্থায়ন প্রক্রিয়া (যেমন, বিমসটেক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড) প্রতিষ্ঠা করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলো ত্বরান্বিত করতে হবে।
  • জাতিসংঘ শান্তি মিশনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সম্মিলিত প্রভাব বাড়াতে একটি 'দক্ষিণ এশীয় শান্তি মিশন সমন্বয় পরিষদ' গঠন করতে হবে, যা প্রতিটি সদস্য দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। এই পরিষদ শান্তি মিশনে সেনা ও পুলিশ মোতায়েনের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম এবং কৌশলগত সমন্বয় সাধন করবে, যা বৈশ্বিক মঞ্চে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক কণ্ঠস্বরকে আরও সুসংহত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator