বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও… | আই নিউজ বিডি

বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ফারহান ফুয়াদ  avatar   
ফারহান ফুয়াদ
বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শিল্প ও নিরাপত্তা ব্যুরো (BIS) কর্তৃক ২০২৩ সালের অক্টোবরে চীনের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে লক্ষ্য করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নতু...

মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শিল্প ও নিরাপত্তা ব্যুরো (BIS) কর্তৃক ২০২৩ সালের অক্টোবরে চীনের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে লক্ষ্য করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের নতুন বিধিনিষেধ আরোপ এবং এই প্রযুক্তি খাতে বেইজিংয়ের ক্ষমতা খর্ব করার স্পষ্ট অভিপ্রায়, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই পদক্ষেপটি শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বিরোধের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বিস্তৃত অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের একটি সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ, যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রণই মূল রণক্ষেত্র। এই অর্থনৈতিক সংঘাত শুধু দুই পরাশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ উভয়ই তৈরি করছে, যেখানে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সামনে এগোতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলের মূলে রয়েছে 'ডি-রিস্কিং' বা ঝুঁকি কমানোর ধারণা, যা চীনা অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস করে আমেরিকান এবং তার মিত্রদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করতে চায়। এর অংশ হিসেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র 'চিপস অ্যান্ড সাইন্স অ্যাক্ট' এর মতো আইন প্রণয়ন করেছে, যার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং গবেষণায় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে। একইসাথে, ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর প্রসপারিটি (IPEF) এর মতো আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে সরবরাহ শৃঙ্খল, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। এই কৌশলগত পদক্ষেপগুলো চীনের বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাবের ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং বিশ্বজুড়ে কোম্পানিগুলোকে তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য করছে। বেইজিং অবশ্য এই চাপ মোকাবিলায় 'দ্বৈত সঞ্চালন' (Dual Circulation) নীতির উপর জোর দিচ্ছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিদেশি নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা চলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপগুলোকে 'একতরফা' এবং 'সংরক্ষণবাদী' নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।

এই অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের বহুমুখী প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। একদিকে, উন্নত দেশগুলো নিজেদের সরবরাহ শৃঙ্খলকে চীন-কেন্দ্রিকতা থেকে সরিয়ে 'ফ্রেন্ড-শোরিং' বা 'নিয়ার-শোরিং' এর দিকে ঝুঁকছে, যা মেক্সিকো, ভিয়েতনাম এবং ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে যারা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এর মাধ্যমে চীনের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ, তারা উভয় পরাশক্তির টানাপোড়েনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। কাঁচামাল, বিশেষত বিরল মৃত্তিকা ধাতু (rare earth minerals) এবং লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের লড়াই তীব্র হচ্ছে, যা উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সহায়ক। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট যেমন BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সুযোগ পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার সুযোগ কাজে লাগাতে হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে চীনের বিশাল বাজার ও অবকাঠামো প্রকল্পের সুবিধাগুলোও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে, যাতে কোনো একটি পক্ষকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন না করা হয় এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত না হয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক উৎপাদন শেয়ারে পরিবর্তন (নির্বাচিত বছর)
সূচক ২০১০ ২০১৫ ২০২০ ২০২৩
যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে পণ্য রপ্তানি (বিলিয়ন ডলার) ৯১.৯ ১১২.২ ১২৪.৭ ১৪৫.২
চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানি (বিলিয়ন ডলার) ৩৪৮.৪ ৪৮৩.২ ৪৫১.৪ ৪২৭১
চীনের বৈশ্বিক উৎপাদন শেয়ার (%) ১৯.৮ ২৫.২ ২৮.৭ ৩১.০
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক উৎপাদন শেয়ার (%) ১৭.৩ ১৬.২ ১৬.৮ ১৫.৫

উৎস: মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ (Bureau of Economic Analysis), বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (UNIDO)

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে একটি 'জাতীয় সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিস্থাপকতা নীতি' (National Supply Chain Resilience Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু মূল পণ্যের জন্য একাধিক উৎস দেশ চিহ্নিত করা হবে এবং আঞ্চলিক উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হবে। এই নীতির অধীনে, উচ্চ-প্রযুক্তি পণ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের জন্য বিকল্প সরবরাহকারী দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা ও সম্প্রসারণের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর মাধ্যমে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং সার্ক অবকাঠামো তহবিল (SAARC Infrastructure Fund) পুনরুজ্জীবিত করে আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো, যা বহিরাগত অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় আঞ্চলিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
  • জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (UNCTAD) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর মতো বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে একটি নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য জোরালো সমর্থন জানানো। বিশেষত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় WTO-এর বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং নতুন বাণিজ্য বিধিমালা প্রণয়নে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর জোরালো করতে হবে, যাতে কোনো একক পরাশক্তির অর্থনৈতিক আধিপত্য হ্রাস পায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান ফুয়াদ

ফারহান ফুয়াদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator