জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের… | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিককালে গাজায় মানবিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক প্রস্তাব ভেটোতে বাতিল হওয়া কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ...

সাম্প্রতিককালে গাজায় মানবিক সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক প্রস্তাব ভেটোতে বাতিল হওয়া কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যখন সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজন, তখন জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠছে। এটি কেবল নীতির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি গভীরতর পদ্ধতিগত অকার্যকারিতার ইঙ্গিত দেয়, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার মূল স্তম্ভকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের মূল ভিত্তি, ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এই সনদের ২৭(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের (P5) ভেটো ক্ষমতা, শুরু থেকেই একটি গভীর দুর্বলতা হিসেবে কাজ করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীনের এই বিশেষ ক্ষমতা তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণের একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, বহুবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করেছে। স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমানের সিরিয়া, ইয়েমেন, বা গাজার মতো পরিস্থিতি, যেখানে লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে, সেখানেও ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ ইচ্ছাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এটি পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয় যে, নীতি প্রণেতারা একটি শক্তিশালী বিশ্বব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করলেও, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং কিছু রাষ্ট্রের বিশেষাধিকার এই ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাগুলোকে চিরস্থায়ী করে দিয়েছে।

জাতিসংঘের বাইরে আঞ্চলিক সংস্থাগুলো, যেমন দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) বা বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (BIMSTEC), আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার জন্য গঠিত হলেও তাদের কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ। সার্ক, তার প্রতিষ্ঠার প্রায় চার দশক পরও, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈরীতার কারণে কার্যত অচল। নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনে ব্যর্থতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, এই সংস্থাগুলোকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আবদ্ধ রেখেছে। অন্যদিকে, বিমসটেক তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তার পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না। এই সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রাখতে পারত, তা মূলত জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাধ্যবাধকতার কারণে সম্ভব হচ্ছে না, যা আবারও নীতি প্রণেতাদের দুর্বলতাকে নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জকেই তুলে ধরে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, এর কার্যকারিতাও প্রায়শই সীমিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দীর্ঘকাল ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম প্রধান সেনা ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশ হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। এই মিশনগুলো প্রায়শই দুর্বল ম্যান্ডেট, অপর্যাপ্ত তহবিল এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ভোগে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যেখানে রাজনৈতিক সমাধান অনুপস্থিত, সেখানে শান্তিরক্ষীরা কেবল মানবিক সংকট মোকাবিলা বা সীমিত পরিসরে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু মূল সংঘাত নিরসনে তাদের ক্ষমতা সীমিত থাকে। উপরন্তু, শান্তিরক্ষীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং জবাবদিহিতার অভাবও এর কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই বাস্তবতাগুলো নির্দেশ করে যে, শুধু শান্তিরক্ষী প্রেরণ নয়, বরং সংঘাতের মূল কারণ চিহ্নিত করে একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রায়শই দুর্বল প্রমাণিত হয়।

বছর মোট শান্তিরক্ষী (বাংলাদেশ) শীর্ষ অবদানকারী দেশ হিসেবে অবস্থান
২০২৩ ৭,৪৯৪ ২য়
২০২২ ৬,৮৫১ ১ম
২০২১ ৬,৪৫৫ ১ম

উৎস: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম (UN Peacekeeping Operations)

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার সংস্কার: প্রস্তাব করা হচ্ছে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য একাধিক স্থায়ী সদস্যের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হোক, অথবা গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা সম্পূর্ণ বাতিল করা হোক। একইসাথে, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশ থেকে নতুন স্থায়ী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে পরিষদের প্রতিনিধিত্বশীলতা বৃদ্ধি করা হোক।
  • আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর আইনি ও কার্যকরী ক্ষমতা বৃদ্ধি: সার্ক ও বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সনদে একটি শক্তিশালী বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া (Dispute Resolution Mechanism) অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর সম্মতিতে একটি আঞ্চলিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে যার রায় বাধ্যতামূলক হবে। এর মাধ্যমে কেবল ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
  • আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া জোরদারকরণ: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এর রায় ও সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে (UN General Assembly) আরও ক্ষমতা প্রদান করা হোক, যাতে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার বাইরেও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator