জাতীয় গ্যাসক্ষেত্র ও গ্রিড: আমদানি নির্ভরতার ফাঁদে বিদ্যুতের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাতীয় গ্যাসক্ষেত্র ও গ্রিড: আমদানি নির্ভরতার ফাঁদে বিদ্যুতের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম  avatar   
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম
জাতীয় গ্যাসক্ষেত্র ও গ্রিড: আমদানি নির্ভরতার ফাঁদে বিদ্যুতের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
জাতীয় গ্যাসক্ষেত্র ও গ্রিড: আমদানি নির্ভরতার ফাঁদে বিদ্যুতের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর পক্ষ থেকে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের ঘোষণা এবং শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে তীব্র ঘাটতি, দেশের জ্বালানি নিরাপত...

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর পক্ষ থেকে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের ঘোষণা এবং শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে তীব্র ঘাটতি, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর মূল্য অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে পেট্রোবাংলাকে রেকর্ড পরিমাণ লোকসানের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত করছে। এই পরিস্থিতি কেবল বর্তমান নয়, দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার কালো মেঘ এনেছে। এক দশক আগেও যেখানে দেশের সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো অভ্যন্তরীণ গ্যাস দিয়ে, সেখানে বর্তমানে প্রায় ৭০% প্রাথমিক জ্বালানি আসে আমদানি নির্ভর উৎস থেকে – যা নিঃসন্দেহে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক দশক ধরে একটি মৌলিক নীতিগত দ্বিধায় ভুগছে। একসময় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে দ্রুত ও সহজ সমাধানের আশায় আমদানি নির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়া হয়। গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলায় এবং স্থলভাগের পুরাতন গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতা, দেশকে আমদানিনির্ভরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পেট্রোবাংলা, যা দেশের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের প্রধান সংস্থা, তাদের নিজস্ব সক্ষমতা ও লোকবল থাকা সত্ত্বেও নতুন কূপ খনন এবং পুরাতন কূপ সংস্কারে কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের সংখ্যা নগণ্য, যা দেশের প্রমাণিত মজুদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই নীতিগত শিথিলতার কারণে, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের একটি বড় অংশ (প্রায় ৩০-৩৫%) উচ্চ মূল্যে এলএনজি হিসেবে আমদানি করতে হচ্ছে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার মুখে দেশকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

এই আমদানি নির্ভরতার আর্থিক চাপ এখন দেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট। বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে জ্বালানি খাতে, যা উন্নয়ন প্রকল্প এবং জনসেবার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সহ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো জ্বালানি খাতে সংস্কারের উপর জোর দিলেও, বিশেষ করে জ্বালানির মূল্য সমন্বয় এবং ভর্তুকি কমানোর উপর তাদের সুপারিশগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে, উচ্চ মূল্যে আমদানি করা জ্বালানির বোঝা শেষ পর্যন্ত সরকারি কোষাগারের উপরই বর্তাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ (MMBTU) এলএনজি প্রায় ৩০-৪০ ডলার মূল্যে আমদানি করতে হয়েছে, যেখানে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন খরচ এর চেয়ে অনেক কম। এই বিশাল ব্যয়ের তারতম্য বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে বিপিডিবি-এর লোকসান বেড়েই চলেছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই আর্থিক চাপ কেবল বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সাল দেশীয় গ্যাস উৎপাদন (MMCFD) এলএনজি আমদানি (MMCFD) মোট গ্যাস সরবরাহ (MMCFD) আমদানি নির্ভরতা (%) (আনুমানিক)
২০১৩-১৪ ২২৫০ ০ ২২৫০ ০%
২০১৭-১৮ ২৭০০ ১০০ ২৮০০ ৩.৫%
২০২০-২১ ২৩৫০ ৭৫০ ৩০০০ ২৫%
২০২২-২৩ ১৮৫০ ১০০০ ২৮৫০ ৩৫%
২০২৩-২৪ (প্রক্ষেপিত) ১৭০০ ১৩০০ ৩০০০ ৪৩%

উৎস: পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (আনুমানিক তথ্য)

সুপারিশ

  • পেট্রোবাংলাকে (Petrobangla) জাতীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি নীতিমালা অনুযায়ী দ্রুত দেশের স্থল ও গভীর সমুদ্রের অব্যবহৃত ব্লকগুলোতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে অথবা নিজস্ব সক্ষমতা ব্যবহার করে অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০১৪ (সংশোধিত) অনুযায়ী সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ প্রকল্প হাতে নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এডিবি (ADB)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা গ্রহণ করে গ্রিড স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) কে একটি স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ জ্বালানি মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সরকারের উপর ভর্তুকির চাপ কমাবে। একই সাথে, বাংলাদেশ সরকার-কে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা (Strategic Petroleum Reserve) বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট আইন ও অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম

প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator