ডেটা ও বাস্তবতা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

তানজিম আহমেদ  avatar   
তানজিম আহমেদ
ডেটা ও বাস্তবতা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক ই-স্পোর্টস বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান নিউজু (Newzoo)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী ই-স্পোর্টস শিল্পের মোট আয় ২.৫ বিলি...

বৈশ্বিক ই-স্পোর্টস বাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান নিউজু (Newzoo)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী ই-স্পোর্টস শিল্পের মোট আয় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা মূলত স্পন্সরশিপ, মিডিয়া স্বত্ব এবং পাবলিশার ফি দ্বারা চালিত হবে। এই অভূতপূর্ব বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি এমন এক সময়ে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, যখন দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী মোবাইল ও পিসি গেমিংয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ায় এবং স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ায় গেমিং কেবল বিনোদন থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ই-স্পোর্টস এবং গেমিং খাতটি মূলত একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে বিকশিত হচ্ছে, যেখানে বিপুল সংখ্যক তরুণ গেমিং কমিউনিটির মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন করছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটির বেশি, যার একটি বড় অংশ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। এই বিশাল ডিজিটাল জনমিতি ই-স্পোর্টসকে একটি উর্বর ভূমি দিয়েছে, যেখানে পাবজি মোবাইল, ফ্রি ফায়ার, কল অফ ডিউটি-এর মতো গেমগুলি লক্ষ লক্ষ খেলোয়াড় ও দর্শক তৈরি করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তর এবং যুব কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপর জোর দিচ্ছে। ই-স্পোর্টস খাতটি সরাসরি এই লক্ষ্যগুলির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে, যদি এটিকে সঠিকভাবে কাঠামোবদ্ধ করা যায়। শুধুমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে নয়, স্ট্রিমার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, কোচ, ইভেন্ট অর্গানাইজার এবং গেম ডেভেলপার হিসেবেও এই খাতটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রাখে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের গেমিং মার্কেট ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারে, যা ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। এই খাতের প্রবৃদ্ধি দেশের সফটওয়্যার ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট শিল্পের সাথেও নিবিড়ভাবে জড়িত, যা স্থানীয় উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বর্তমানে, অনেক তরুণ গেমিং প্ল্যাটফর্মে নিজেদের তৈরি করে আয়ের পথ খুঁজছে, যা তাদের ব্যক্তিগত অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং একই সাথে দেশের গ্রামীণ ও শহর উভয় এলাকার ডিজিটাল বিভাজন কমাতে সাহায্য করছে, কারণ মোবাইল গেমিংয়ের জন্য উচ্চমানের পিসি বা কনসোল সর্বদা প্রয়োজন হয় না।

তবে, এই সম্ভাবনাময় খাতের পূর্ণাঙ্গ বিকাশে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব। ই-স্পোর্টসের জন্য উচ্চগতির স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ, ডেডিকেটেড গেমিং এরেনা এবং উন্নত সার্ভার প্রয়োজন, যা এখনও দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে সুলভ নয়। এছাড়াও, এই খাতের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অনুপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করছে। বর্তমানে, ই-স্পোর্টসকে খেলাধুলা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দেওয়ায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনের মতো দেশগুলোতে ই-স্পোর্টসকে জাতীয় খেলাধুলার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। বাংলাদেশেও ই-স্পোর্টসকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে, যেখানে গেম পাবলিশার, হার্ডওয়্যার প্রস্তুতকারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং মিডিয়া সংস্থাগুলো একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কিন্তু ই-স্পোর্টসকে কেন্দ্র করে সরাসরি কোনো সমন্বিত কৌশল এখনো অনুপস্থিত। এই খাতের মাধ্যমে কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশি গেমিং ট্যালেন্ট এবং গেম ডেভেলপমেন্ট পরিষেবা রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি ই-স্পোর্টস ইভেন্টগুলো পর্যটন শিল্পকেও চাঙ্গা করতে পারে, বিদেশি খেলোয়াড় ও দর্শকদের আকর্ষণ করে। সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এই অপ্রচলিত খাতটি দেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম।

সূচক ২০২৩ (আনুমানিক) ২০২৫ (প্রক্ষেপিত) ২০২৭ (প্রক্ষেপিত)
বৈশ্বিক ই-স্পোর্টস বাজার আয় (বিলিয়ন USD) ১.৮ ২.২ ২.৫
বাংলাদেশের গেমিং মার্কেট সাইজ (মিলিয়ন USD) ৩৮০ ৪৮০ ৬০০
বাংলাদেশের মোট অনলাইন গেমার সংখ্যা (কোটি) ৫.৫ ৬.৮ ৮.২
মোবাইল গেমিংয়ের অংশীদারিত্ব (%) ৮৫ ৮৭ ৮৮

উৎস: নিউজু গ্লোবাল ই-স্পোর্টস মার্কেট রিপোর্ট (২০২৩), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), স্থানীয় বাজার গবেষণা ও বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় ই-স্পোর্টস কৌশলপত্র ও নীতিমালা (National eSports Policy) প্রণয়ন করা হবে, যা ই-স্পোর্টসকে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাধুলা হিসেবে স্বীকৃতি দেবে এবং এর জন্য একটি স্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করবে। এই নীতিমালায় ই-স্পোর্টস ইভেন্ট আয়োজন, খেলোয়াড়দের কল্যাণ, এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকনির্দেশনা থাকবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)-এর মাধ্যমে, ই-স্পোর্টস অবকাঠামো (যেমন – উচ্চগতির ইন্টারনেট, ডেডিকেটেড গেমিং এরেনা) নির্মাণে এবং স্থানীয় গেমিং স্টুডিওগুলোর জন্য কর অবকাশ ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করবে, যা এই খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ই-স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট, গেম ডেভেলপমেন্ট, স্ট্রিমিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন বিষয়ক বিশেষায়িত কোর্স ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করবে, যা এই খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিম আহমেদ

তানজিম আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator