অটোমোবাইল ও ই-ভি (EV) যানবাহন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অটোমোবাইল ও ই-ভি (EV) যানবাহন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

সাজ্জাদ হোসেন  avatar   
সাজ্জাদ হোসেন
অটোমোবাইল ও ই-ভি (EV) যানবাহন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
অটোমোবাইল ও ই-ভি (EV) যানবাহন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (BPDB) ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রধান শহরগুলোতে ৫০০টি অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) চার্জি...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (BPDB) ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রধান শহরগুলোতে ৫০০টি অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা, দেশের অটোমোবাইল শিল্পে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য কেবল পরিবেশবান্ধব পরিবহনের দিকে বাংলাদেশের অভিযাত্রার একটি অংশ নয়, বরং এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। যদিও ঐতিহ্যবাহী জীবাশ্ম-জ্বালানি নির্ভর যানবাহনের বাজার এখনও বিশাল, ই-ভি প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং সরকারি নীতি সহায়তার কারণে এই খাত অদূর ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের অটোমোবাইল শিল্প মূলত আমদানিনির্ভর, যেখানে সম্পূর্ণ তৈরি যানবাহন (CBU) এবং আংশিকভাবে তৈরি যন্ত্রাংশ (CKD/SKD) আমদানি করে স্থানীয়ভাবে সংযোজন করা হয়। এই নির্ভরতা একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি দেশের ভারী শিল্প বিকাশের পথেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তবে, বৈদ্যুতিক যানবাহনের উত্থান স্থানীয় উৎপাদন এবং সংযোজন শিল্পকে এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। World Bank-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ই-ভি প্রযুক্তির স্থানীয়করণ কেবল আমদানি ব্যয় কমায় না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তি স্থানান্তরেও সহায়তা করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশ সরকার 'রূপকল্প ২০৪১' বাস্তবায়নে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত নীতি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে, যা স্থানীয়ভাবে ই-ভি যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির গবেষণায় বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। বর্তমানে, দেশের কিছু স্থানীয় উদ্যোক্তা হালকা ই-ভি এবং চার্জিং অবকাঠামো তৈরিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ শুরু করেছে, যা একটি ইতিবাচক লক্ষণ।

বৈদ্যুতিক যানবাহনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নির্ভরযোগ্য চার্জিং অবকাঠামোর অভাব এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির স্থানীয়করণ। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'Sustainable Transport Initiative' এর আওতায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে ই-ভি অবকাঠামো উন্নয়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রণয়নের কাজ করছে, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে ই-ভি চার্জিংয়ের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া, ই-ভি ব্যাটারির দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি, কারণ এর বেশিরভাগই এখনও আমদানি-নির্ভর। বাংলাদেশ সরকার এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA) এর আওতায় বিশেষ সুবিধা প্রদানের চিন্তাভাবনা করছে, যাতে স্থানীয়ভাবে ব্যাটারি অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা যায়।

ই-ভি খাতের সম্ভাবনা কেবল পরিবেশগত বা জ্বালানি সাশ্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের ভারী শিল্প বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মোটর, কন্ট্রোলার, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং চেসিস নির্মাণে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ই-ভি রেজিস্ট্রেশন এবং নিরাপত্তা মান নির্ধারণে কাজ করছে, যা ভোক্তাদের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে। ই-ভি প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণে, স্থানীয় গবেষক এবং প্রকৌশলীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং অন্যান্য কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ই-ভি প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিশেষায়িত কোর্স চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়। এই সমন্বিত উদ্যোগই দেশকে ই-ভি বিপ্লবের অগ্রভাগে নিয়ে যেতে পারে।

সূচক ২০২০ ২০২২ ২০২৪ (অনুমান) ২০৩০ (লক্ষ্য)
মোট নিবন্ধিত যানবাহন (লক্ষ) ৪৩.৫ ৫০.২ ৫৬.০ ৭৫.০
ই-ভি নিবন্ধিত যানবাহন (হাজার) ০.২ ৪.৫ ১৮.০ ২৫০.০
পাবলিক চার্জিং স্টেশন (সংখ্যা) ২ ১৫ ৫০ ৫০০
ই-ভি বাজারে অংশীদারিত্ব (%) ০.০১ ০.১ ০.৩ ৩.০

উৎস: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এবং বিদ্যুৎ বিভাগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • সরকারকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি 'জাতীয় ই-ভি উৎপাদন ও গবেষণা নীতি' প্রণয়ন করতে হবে, যা স্থানীয়ভাবে ই-ভি ব্যাটারি, মোটর ও পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের জন্য কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করবে।
  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) এর সাথে সমন্বয় করে একটি 'স্মার্ট গ্রিড-ইন্টিগ্রেটেড চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়ন নীতিমালা' তৈরি করতে হবে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য ই-ভি চার্জিং স্টেশন স্থাপনে সহজ লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষ ট্যারিফ প্রণোদনা দেবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগকে যৌথভাবে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এর মাধ্যমে ই-ভি প্রযুক্তি, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং চার্জিং স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে আগামী পাঁচ বছরে কমপক্ষে ৫,০০০ দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাজ্জাদ হোসেন

সাজ্জাদ হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অটোমোবাইল ও ই-ভি (EV) যানবাহন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator