বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

নাবিল কায়সার  avatar   
নাবিল কায়সার
বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (BCB) বার্ষিক আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যুব ও তৃণমূল ক্রিকেট উন্নয়নে বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের অব্যবহৃত থাকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দেশের ক্রিকেট কাঠামো এবং এর পাইপলাইন ফিন্যান্সের গভীর দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে। গত অর্থবছরে অনূর্ধ্ব-১৯ এবং জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট উন্নয়নে বরাদ্দকৃত প্রায় ৩০ শতাংশ তহবিল অপব্যবহৃত থাকার এই তথ্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (National Sports Council) প্রকাশিত প্রতিবেদনেও প্রতিফলিত হয়েছে। এই চিত্র কেবল আর্থিক অব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয় না, বরং এটি ভবিষ্যতের জাতীয় দলের জন্য প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়াকে কিভাবে বাধাগ্রস্ত করছে, তারও এক সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। একদিকে যেখানে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য একটি শক্তিশালী পাইপলাইন অপরিহার্য, অন্যদিকে আর্থিক বণ্টনে এমন অদক্ষতা দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত। এই অদক্ষতা শুধু খেলার মানকেই নয়, বরং এই খাতের উপর নির্ভরশীল একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও সীমিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ক্রীড়া শিল্পকে বিকশিত হতে দিচ্ছে না।

বাংলাদেশের ক্রিকেট পাইপলাইন ফিন্যান্সের বর্তমান কাঠামোতে বেশ কিছু মৌলিক সমস্যা বিদ্যমান। তহবিল বন্টনের প্রক্রিয়াটি প্রায়শই কেন্দ্রীভূত থাকে, যেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) থেকে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে অর্থ পৌঁছাতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা যায়। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো (District Sports Associations) প্রায়শই অভিযোগ করে যে, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ সময় মতো পৌঁছায় না, অথবা যে অর্থ আসে, তা নির্দিষ্ট প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত হয় না। এর ফলে, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেট একাডেমিগুলোর আধুনিকীকরণ, মানসম্পন্ন কোচ নিয়োগ, খেলার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং নিয়মিত টুর্নামেন্টের আয়োজন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে প্রতিভার অভাব নেই, সেখানে সুযোগের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় ঝরে পড়ছে। এই আর্থিক প্রবাহের অকার্যকারিতা কেবলমাত্র খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের ক্ষতি করছে না, বরং একটি টেকসই ক্রীড়া ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই এই অর্থ প্রবাহের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিক সময়ে সঠিক খাতে পৌঁছায় এবং তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সহায়তা কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক ও অবকাঠামোগত প্রকল্পে সফলভাবে অর্থায়ন করেছে, যার মধ্যে ক্রীড়া অবকাঠামো এবং যুব উন্নয়নও অন্তর্ভুক্ত। যদিও বাংলাদেশে সরাসরি ক্রিকেট পাইপলাইন ফিন্যান্সে তাদের বড় আকারের বিনিয়োগের দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই, তবে তাদের কারিগরি সহায়তা এবং স্বল্প সুদের ঋণ ক্রীড়া খাতের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংক শ্রীলঙ্কায় ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করেছে, যা তাদের যুব ক্রীড়া কর্মসূচীকে শক্তিশালী করেছে। একইভাবে, ADB ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে যুবকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে, যা পরোক্ষভাবে খেলাধুলার মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তৈরি করে World Bank বা ADB-এর কাছে উপস্থাপন করতে পারে, যেখানে তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত একটি সমন্বিত ক্রিকেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের পরিকল্পনা থাকবে। এই অর্থায়ন শুধুমাত্র একাডেমি নির্মাণ বা প্রশিক্ষক নিয়োগেই সীমাবদ্ধ না রেখে, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং শিক্ষাগত সহায়তাও নিশ্চিত করবে, যা তাদের একটি সামগ্রিক বিকাশে সহায়ক হবে। এই ধরনের একটি সমন্বিত মডেল শুধুমাত্র আর্থিক প্রবাহকেই সুসংগঠিত করবে না, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মান এবং স্বচ্ছতার মানদণ্ডও নিশ্চিত করবে।

একটি শক্তিশালী ক্রিকেট পাইপলাইন গড়ে তোলার অর্থনৈতিক প্রভাব কেবল খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। একটি সুসংগঠিত পাইপলাইন থেকে প্রতি বছর নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি হলে, তাদের মাধ্যমে ক্রীড়া সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক, পোশাক শিল্প, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন সংস্থা এবং এমনকি ক্রীড়া পর্যটন খাতও উপকৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপ জেতে, তখন কিশোর ও যুবকদের মধ্যে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা স্থানীয় কোচিং সেন্টার এবং ক্রীড়া সামগ্রীর দোকানে বিক্রি বাড়িয়ে দেয়। এই ধরনের সাফল্য স্পন্সরশিপ এবং মিডিয়া স্বত্ব থেকে BCB-এর আয়ও বৃদ্ধি করে, যা আবার পাইপলাইন উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। তবে, এই চক্রকে কার্যকর করতে হলে পাইপলাইন ফিন্যান্সে একটি স্পষ্ট বিনিয়োগ কৌশল এবং তার সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার যদি ক্রীড়া খাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করে এবং তার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ করে, তবে তা কেবল ক্রিকেটকেই নয়, বরং সামগ্রিক ক্রীড়া শিল্পকেও চাঙ্গা করতে পারে। এতে করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণেরও সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির দিগন্ত প্রসারিত করবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে।

সাল মোট বরাদ্দকৃত তহবিল (কোটি টাকা) একাডেমি উন্নয়ন (শতাংশ) অনূর্ধ্ব-১৯ প্রোগ্রাম (শতাংশ) জেলা পর্যায়ের সহায়তা (শতাংশ) অব্যবহৃত তহবিল (শতাংশ)
২০২০ ১২০ ৩৫% ৩০% ২০% ১৫%
২০২১ ১৫০ ৪০% ২৫% ২২% ১৩%
২০২২ ১৮০ ৩০% ৩০% ২৫% ১৫%
২০২৩ ২০০ ৩৫% ২৮% ২০% ১৭%

উৎস: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (National Sports Council) নিরীক্ষা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়) অবিলম্বে একটি 'ক্রীড়া অর্থায়ন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আইন' প্রণয়ন করবে, যার অধীনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) এবং সকল জেলা ক্রীড়া সংস্থার জন্য ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে। এই আইন বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (National Sports Council) একটি স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি গঠন করবে, যারা নিয়মিত আর্থিক তদারকি নিশ্চিত করবে এবং অনিয়ম রোধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং World Bank/ADB-এর যৌথ অর্থায়নে একটি 'জাতীয় ক্রিকেট পাইপলাইন উন্নয়ন তহবিল' গঠন করা হবে, যার লক্ষ্য হবে আগামী ৫ বছরে দেশের প্রতিটি বিভাগে ন্যূনতম একটি অত্যাধুনিক ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং অনূর্ধ্ব-১৩ থেকে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বৃত্তি প্রদান। এই তহবিলের ব্যবস্থাপনা একটি স্বাধীন বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হবে, যার কার্যকারিতা বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা নিয়মিত নিরীক্ষিত হবে এবং তহবিল ব্যবহারের উপর কঠোর নজরদারি থাকবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (National Sports Council)কে 'ক্রিকেট ট্যালেন্ট হান্ট ও ডেভেলপমেন্ট পলিসি-২০২৫' প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হবে, যেখানে স্কুল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের চিহ্নিতকরণ, দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ কর্মসূচী এবং পেশাদার কোচিংয়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকবে। এই নীতির অধীনে, দেশের প্রতিটি জেলায় ন্যূনতম দুটি মানসম্পন্ন ক্রিকেট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে অভিজ্ঞ কোচ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে, যার তত্ত্বাবধান ও অর্থায়ন নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়)।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিল কায়সার

নাবিল কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator