পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক যৌথভাবে প্রকাশিত একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দেশের প্রধান নদীগুলোর অবব...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক যৌথভাবে প্রকাশিত একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দেশের প্রধান নদীগুলোর অববাহিকায় গত দশকের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ গড়ে ১৫-২০% হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের কৃষি উৎপাদন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য উভয়ের উপরই গভীর প্রভাব ফেলছে। এই তথ্য বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার একটি বাস্তবিক চিত্র তুলে ধরে। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলির উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি খাতকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেকসই বিনিয়োগ এবং দূরদর্শী নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের কৃষি খাত, যা দেশের জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস, তা সরাসরি এই পানি সংকটের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে উদ্বেগজনক হারে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ এবং লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) উভয়ই কম পানি-নির্ভরশীল এবং খরা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, BRRI কর্তৃক উদ্ভাবিত খরা-সহনশীল ধানের জাত এবং BARI কর্তৃক উদ্ভাবিত স্বল্প-সেচের সবজি ও ডাল ফসলের জাত কৃষকদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে, এই গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এর ফলাফল মাঠ পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও ব্যাপক বিনিয়োগ এবং DAE এর মাধ্যমে কার্যকর সম্প্রসারণ কর্মসূচির প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি বণ্টনে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে না পারা বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ কেবল বাঁধ নির্মাণ বা নদী ড্রেজিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এতে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নও অন্তর্ভুক্ত। পরিবেশ মন্ত্রণালয় দেশের বিভিন্ন পানি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) বাধ্যতামূলক করেছে, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। তবে, এই EIA প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে সম্ভাব্য সকল পরিবেশগত ঝুঁকি সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কৃষি খাতে পানি ব্যবস্থাপনার উপর সমন্বিত গবেষণা কর্মসূচী পরিচালনা করছে, যেখানে নতুন সেচ পদ্ধতি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং লবণাক্ততা সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের গবেষণা শুধু নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে না, বরং নীতি নির্ধারকদের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধানও সরবরাহ করে। তা সত্ত্বেও, দেশের বিশাল কৃষিভূমি এবং অসংখ্য কৃষকের কাছে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতের ব্যাপক বিনিয়োগ অপরিহার্য। পাশাপাশি, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সংলাপ আরও জোরদার করা উচিত, যেখানে অভিন্ন নদী অববাহিকার দেশগুলো একত্রিত হয়ে পানি বণ্টনের একটি সুষম এবং টেকসই কাঠামো তৈরি করতে পারে।

পানি ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন-প্ররোচিত অস্বাভাবিক বন্যা, শুষ্কতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অন্যতম। বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা সুন্দরবন এবং উপকূলীয় কৃষি জমিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা জীববৈচিত্র্য এবং কৃষি উৎপাদন উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন অভিযোজন কৌশল নিয়ে কাজ করছে, যেমন – লবণাক্ততা সহনশীল প্রজাতির বনায়ন এবং উপকূলীয় অঞ্চলে মিষ্টি পানির জলাধার নির্মাণ। কিন্তু এসব উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা বাড়াতে আরও সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষত, ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অত্যাধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা জরুরি, যা পানি প্রবাহের পূর্বাভাস, বন্যা সতর্কতা এবং খরা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে একটি সামগ্রিক এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা যায়।

বছর পানি সম্পদ খাতে মোট সরকারি বিনিয়োগ (কোটি টাকা) সেচকৃত কৃষি জমির পরিমাণ (লক্ষ হেক্টর) ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল সেচ (শতাংশ) লবণাক্ততা প্রভাবিত কৃষি জমির পরিমাণ (লক্ষ হেক্টর)
২০১৮-১৯ ৬,৫০০ ৫২.৫ ৭২% ১০.২
২০১৯-২০ ৭,২০০ ৫৩.০ ৭৪% ১০.৪
২০২০-২১ ৭,৮০০ ৫৩.৮ ৭৫% ১০.৬
২০২১-২২ ৮,৫০০ ৫৪.৫ ৭৬% ১০.৮
২০২২-২৩ (প্রাক্কলিত) ৯,২০০ ৫৫.০ ৭৭% ১১.০

উৎস: অর্থ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন (বিভিন্ন বছর)।

সুপারিশ

  • জাতীয় পানি নীতি ১৯৯৯-কে আধুনিকীকরণ করে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠস্থ পানির সুষম ব্যবহারের নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা। এই নীতি প্রণয়নে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে, যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রমে বিনিয়োগ দ্বিগুণ করে স্বল্প-পানি ও লবণাক্ততা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর মাধ্যমে এসব নতুন প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচী এবং প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা আবশ্যক, যা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর সমন্বিত গবেষণা ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।
  • আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি বণ্টনে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলো পর্যালোচনা ও জোরদার করতে হবে। একই সাথে, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত কঠোর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নদী ড্রেজিং, বাঁধ নির্মাণ এবং জলাধার সৃষ্টি প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত, যাতে এসব প্রকল্প পরিবেশের উপর ন্যূনতম নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধান প্রদান করে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator