সম্প্রতি, দেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পে স্থানীয় উৎপাদন ও সংযোজনের এক উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, ওয়ালটন, মিনিস্টার এবং সিঙ্গার-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর ও অন্যান্য গৃহস্থালী ইলেকট্রনিক্স পণ্যের স্থানীয় বাজার দখল করে নিয়েছে, যা দেশের আমদানি নির্ভরতা কিছুটা কমিয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে, স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজার প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় একটি ইতিবাচক ধারা নির্দেশ করে। তবে, এই সাফল্যের আড়ালে একটি অপ্রকাশিত সত্য রয়ে গেছে: এই শিল্পের মূল ভিত্তি, অর্থাৎ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও ফ্যাব্রিকেশন, এখনও বাংলাদেশের নাগালের বাইরে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চালিকাশক্তি এই ক্ষুদ্র চিপগুলো প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে, যা আমাদের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বকে সীমাবদ্ধ করে এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতার মুখে দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ফেলে দেয়।
বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পের এই প্রবৃদ্ধি মূলত অ্যাসেম্বলিং বা সংযোজনভিত্তিক। এখানে ডিজাইন, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন – যা একটি পণ্যের প্রকৃত মেধা সম্পদ তৈরি করে – তার অনুপস্থিতি স্পষ্ট। এর ফলে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যগুলোর মূল্য সংযোজন তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং আমরা কেবল অন্যের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ভোক্তা হিসেবেই রয়ে যাই। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ঘাটতি, যা ২০২১-২২ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, তা আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সেই সংকটের সময়, কাঁচামাল ও সেমিকন্ডাক্টরের অভাবে অনেক স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্মুখীন হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, যতক্ষণ না আমরা চিপ ডিজাইন ও ফ্যাব্রিকেশনের মতো মৌলিক সক্ষমতা অর্জন করছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বৈশ্বিক বাজারের অপ্রত্যাশিত ঝামেলার মুখে অরক্ষিত থাকব। এই নির্ভরতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতভাবেও দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, বিশেষ করে যখন আমরা 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গঠনের স্বপ্ন দেখছি, যার মূলে রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
সরকার 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' থেকে 'স্মার্ট বাংলাদেশ'-এর পথে হাঁটছে এবং এই যাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগ এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। BHTPA তার হাই-টেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর অব্যাহতি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা প্রণোদনা দিচ্ছে। এসব উদ্যোগ ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলিং এবং সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে কিছু বিনিয়োগ আকর্ষণ করলেও, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন হাউস বা একটি পরীক্ষামূলক ফ্যাব্রিকেশন সুবিধার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এখনও অনুপস্থিত। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) যদিও একটি শক্তিশালী হার্ডওয়্যার ইকোসিস্টেমের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে, তবে জটিল চিপ ডিজাইন প্রশিক্ষণ বা গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য অংশীদারিত্বের মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত 5G এবং IoT ডিভাইসের মান নির্ধারণে একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারত, যা স্থানীয় চিপ উন্নয়নে একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু বর্তমান প্রবিধানগুলো মূলত টেলিযোগাযোগ পরিষেবার উপরই বেশি মনোযোগ দেয়, উন্নত হার্ডওয়্যার স্পেসিফিকেশনের উপর নয়, যা এই খাতের সুষম বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এমনকি a2i (অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবা প্রদানে সফল হলেও, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ-দক্ষ জনবল তৈরিতে এর সরাসরি অবদান এখনও সীমিত।
| সূচক | ২০২১ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ২০২২ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ২০২৩ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) |
|---|---|---|---|
| ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানি | ৯,৫০০ | ১১,২০০ | ১২,৫০০ |
| সেমিকন্ডাক্টর ও আইসি আমদানি | ২,২০০ | ২,৬০০ | ৩,১০০ |
| স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন (মূল্য) | ২,১০০ | ২,৭০০ | ৩,৩০০ |
| স্থানীয় উৎপাদনে ব্যবহৃত উপাদান (বিদেশী) | ১,৮০০ | ২,৩০০ | ২,৮০০ |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), BHTPA বার্ষিক প্রতিবেদন (তথ্যগুলো অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আনুমানিক)
সুপারিশ
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় অ্যাডভান্সড সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও প্রোটোটাইপিং সেন্টার' স্থাপন করতে হবে। এই সেন্টারকে গবেষণা অনুদান, মেধা বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে প্রতি বছর ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।
- বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিদ্যমান হাই-টেক পার্ক নীতির অধীনে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর বিনিয়োগ প্রণোদনা প্যাকেজ' চালু করতে হবে। এই প্যাকেজে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন বা অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং সুবিধা স্থাপনকারী কোম্পানিগুলোকে ১৫ বছরের কর্পোরেট কর অবকাশ, বিশেষায়িত ফ্যাব্রিকেশন সরঞ্জাম আমদানিতে ১০০% শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং সরাসরি মূলধন অনুদান প্রদান করতে হবে।
- বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) কে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত সকল IoT এবং উন্নত ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের জন্য বাধ্যতামূলক প্রযুক্তিগত মান প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে। এই কাঠামোতে নিরাপত্তা, আন্তঃঅপারেবিলিটি এবং শক্তি দক্ষতার বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, যা উচ্চ মানের স্থানীয় উপাদান একীকরণের জন্য একটি চাহিদা তৈরি করবে এবং স্থানীয় মেধা সম্পদ বিকাশে সহায়তা করবে।