ডেটা ও বাস্তবতা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

লে. কর্নেল (অব.) আসাদ  avatar   
লে. কর্নেল (অব.) আসাদ
ডেটা ও বাস্তবতা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক' (আইপিও) বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ক...

সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক' (আইপিও) বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই কৌশলগত দলিলটি উন্মোচন করেছে যে, ঢাকা শুধুমাত্র বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের নীরব দর্শক নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে আগ্রহী। এই আউটলুকটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং একই সাথে ক্ষমতা প্রদর্শনের এক জটিল রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। এর ফলে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামরিক জোট গঠন, এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের পুনর্গঠন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার বহুমাত্রিকতা এবং এর অন্তর্নিহিত প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জগুলো নিরন্তর বিশ্লেষণের দাবি রাখে, বিশেষ করে যখন ডেটা ও বাস্তবতার নিরিখে এর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা হয়।

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সহযোগিতার অপার সম্ভাবনা বিদ্যমান, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে তীব্র কৌশলগত প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রধান শক্তিগুলো তাদের নিজ নিজ প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং প্রযুক্তিগত আদান-প্রদানকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের মতো বিতর্কিত জলসীমায় সামরিকীকরণ এবং বঙ্গোপসাগরে ক্রমবর্ধমান নৌ-তৎপরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছে, যা কোনো একক ব্লকের দিকে ঝুঁকে না পড়ে বরং সকলের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমৃদ্ধির পথ সুগম করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে অবাধ ও উন্মুক্ত নৌচলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS) দ্বারা সমর্থিত এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। এই নীতি আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহকে সুরক্ষিত রাখতে এবং সমুদ্রসম্পদ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রতিরক্ষা খাতের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক ব্যয় এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI) এর তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ। এই ব্যয় বৃদ্ধি শুধুমাত্র প্রচলিত সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ প্রতিরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক সক্ষমতা অর্জনেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকেও এই আঞ্চলিক সামরিকায়নের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে, কেবল সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহই নয়, বরং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি, নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য। BIMSTEC এর মতো আঞ্চলিক ফোরামগুলো সমুদ্র নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মানব পাচার রোধে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে, যা সামগ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করবে। তবে, BIMSTEC এর কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরও বেশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সম্পদ ভাগাভাগি প্রয়োজন।

আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে সার্ক (SAARC) এর ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপটে এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেকার দ্বিপাক্ষিক বিরোধ এবং মতপার্থক্য সার্ককে কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে বাধা দিয়েছে। এর বিপরীতে, বাংলাদেশ UN Peacekeeping মিশনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সেনা ও পুলিশ প্রদানকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় তার অঙ্গীকারের প্রমাণ রেখেছে। এই অংশগ্রহণ কেবল বাংলাদেশের সামরিক পেশাদারিত্বেরই পরিচয় দেয় না, বরং দেশের কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারেও সহায়তা করে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অধীনে, এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে কাজে লাগানো সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে UN Peacekeeping এর আদলে একটি আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ শান্তিরক্ষীরা নেতৃত্ব দিতে পারেন। একই সাথে, আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার মাধ্যমে সমুদ্রসীমায় অবৈধ কার্যকলাপ, যেমন - মাদক চোরাচালান ও জলদস্যুতা, দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

পরিমাণ ২০২২ সাল ২০২৩ সাল ২০২৪ সাল (জানুয়ারি)
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের মোট জনবল ৬,৮৫২ জন ৭,৪৯০ জন ৭,৯২৫ জন
বিশ্বে শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় প্রথম প্রথম
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট (মোট জিডিপি'র শতাংশ) ১.২২% ১.১৮% ১.২৩% (প্রাক্কলিত)

উৎস: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ডেটাবেজ, বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য একটি 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এন্ড অ্যানালাইসিস সেল' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই সেল আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ, ডেটা-ভিত্তিক নীতি সুপারিশ তৈরি এবং নিয়মিতভাবে জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৌশলগত প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে, যা বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস অর্ডার ১৯৭২ এর অধীনে তাদের ম্যান্ডেটকে আরও সুসংহত করবে।
  • BIMSTEC এর অধীনে একটি 'বে অফ বেঙ্গল মেরিটাইম সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা সমুদ্র নিরাপত্তা, জলদস্যুতা দমন, অবৈধ মাছ ধরা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে নিয়মিত যৌথ মহড়া ও তথ্য আদান-প্রদানকে বাধ্যতামূলক করবে। এই ফ্রেমওয়ার্কটি BIMSTEC চার্টার ও এর বিদ্যমান সুরক্ষা চুক্তির অধীনে কার্যকর হবে এবং সদস্য দেশগুলোর নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে একটি স্থায়ী সচিবালয় গঠন করবে।
  • বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়াকে 'ফোর্সেস গোল ২০৩০' এবং প্রতিরক্ষা ক্রয় নীতি (Defence Procurement Policy) ২০১৭ এর আলোকে আরও গতিশীল করতে হবে। বিশেষ করে, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক নজরদারি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সরঞ্জাম ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে কেবল বৈদেশিক নির্ভরতা কমবে না, বরং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বাংলাদেশের স্বাবলম্বীতাও বৃদ্ধি পাবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: লে. কর্নেল (অব.) আসাদ

লে. কর্নেল (অব.) আসাদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও প্রতিরক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator