সম্প্রতি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ ছুঁয়েছে, যা বিগত এক দশকে প্রায় দ্বিগুণ। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে আন্তর্জাতিক বৃত্তি নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী তরুণের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষার জন্য উপলব্ধ সহস্রাধিক স্কলারশিপের বিপরীতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তির হার এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম, যা একটি গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষায় বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে, যেখানে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতেও একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে।
এই অপ্রকাশিত সত্যের মূলে রয়েছে আমাদের উচ্চশিক্ষা কাঠামোর সঙ্গে বৈশ্বিক মান ও চাহিদার মৌলিক অমিল। ইউজিসি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য পাঠ্যক্রম অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকলেও, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক গবেষণা ও শিল্প চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য অত্যাবশ্যক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, রোবোটিক্স ও সাইবার সিকিউরিটির মতো বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত আধুনিক কোর্স ও গবেষণার সুযোগ সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে, কোর্স কারিকুলাম পুরোনো এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের চেয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা প্রস্তাবনা ও প্রজেক্ট-ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি তৈরি করে। এর ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার সংখ্যাও কম, যা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম প্রণয়নের কথা বলা হলেও, বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর।
দ্বিতীয়ত, ভাষা দক্ষতা এবং বিশেষায়িত কারিগরি জ্ঞানের অভাব বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির পথে একটি বড় বাধা। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষতা ঘাটতি চিহ্নিতকরণ এবং প্রশিক্ষণের জন্য কাজ করলেও, উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ইংরেজি ভাষা দক্ষতা (যেমন IELTS, TOEFL) এবং গবেষণামুখী বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট সমন্বিত কর্মসূচির অভাব স্পষ্ট। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে প্রথাগত কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, সেগুলো প্রায়শই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গ্লোবাল স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমানের ল্যাবরেটরি দক্ষতা বা সফটওয়্যার প্রয়োগের জ্ঞান দিতে পারে না। দেশের বাইরে উন্নত ল্যাবরেটরি সুবিধা ও গবেষণা তহবিলের জন্য আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে এই ধরনের দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ফলাফল ভালো হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ভাষা ও কারিগরি দক্ষতার অভাবে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের মৌখিক পরীক্ষায় বা আবেদন প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়ে।
| সূচক | ২০২২ | ২০২৩ |
|---|---|---|
| উচ্চশিক্ষায় মোট স্নাতক সংখ্যা (BANBEIS আনুমানিক) | ৪,৫০,০০০+ | ৪,৭০,০০০+ |
| আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী (শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রদত্ত) | ৭৫,০০০+ | ৮২,০০০+ |
| পূর্ণ স্কলারশিপ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর শতাংশ (আনুমানিক) | ৪.৫% | ৪.৭% |
| NSDA চিহ্নিত শীর্ষ ৩ দক্ষতা ঘাটতি (উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট) | উন্নত গবেষণা পদ্ধতি, আন্তর্জাতিক ভাষা দক্ষতা, ডেটা অ্যানালিটিক্স | |
উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-২৩, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, NSDA ও BANBEIS এর বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত তথ্য।
সুপারিশ
- শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট সকল বিশ্ববিদ্যালয়কে সমন্বিতভাবে 'ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্ক' (NQF) এর আওতায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জরুরি ভিত্তিতে সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ করতে হবে। বিশেষ করে, গবেষণা পদ্ধতি, ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং এবং আন্তঃবিষয়ক জ্ঞানের ওপর জোর দিতে হবে এবং প্রতি তিন বছর অন্তর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনার জন্য একটি বাধ্যতামূলক আইন প্রণয়ন করতে হবে।
- ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে 'স্কলারশিপ ওরিয়েন্টেড স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম' চালু করতে হবে, যেখানে IELTS/TOEFL প্রস্তুতির পাশাপাশি উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স, প্রোগ্রামিং ভাষা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ লেখার কৌশল শেখানো হবে। এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে।
- BANBEIS-কে একটি কেন্দ্রীভূত 'গ্লোবাল স্কলারশিপ ইনফরমেশন হাব' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বিশ্বের সকল প্রধান স্কলারশিপের তথ্য, আবেদনের প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং সফল শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। পাশাপাশি, ইউজিসি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন করে 'আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ উপদেষ্টা' নিয়োগের জন্য বাধ্যতামূলক নীতিমালা জারি করবে, যিনি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ ও সহায়তা দেবেন।