ডেটা ও বাস্তবতা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

রেহানা পারভীন  avatar   
রেহানা পারভীন
ডেটা ও বাস্তবতা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও, উচ্চ-মূল্যের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত (TVET) খাতে তাদের সম্পৃক্ততা এখনো প্রত্যাশিত স্তরে পৌঁছায়নি। এই তথ্য নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন খাতের বাস্তব চিত্র এবং নীতিগত কার্যকারিতা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়নের দাবি রাখে। যেখানে এক দশক আগেও নারী শিক্ষার হার নিয়ে প্রশ্ন ছিল, সেখানে আজ প্রশ্ন উঠছে অর্জিত শিক্ষা ও দক্ষতা নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে কতটা সহায়ক হচ্ছে, বিশেষ করে উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের আত্মপ্রকাশে।

BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতার দিকে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। তবে, এই পরিসংখ্যানের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যে, STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) এবং কারিগরি শিক্ষা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) পরিচালিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার সামগ্রিকভাবে বাড়লেও, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বৃদ্ধি মন্থর। উদাহরণস্বরূপ, গত পাঁচ বছরে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর হার ২০-২৫% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট নয়। এই বৈষম্য প্রাথমিক পর্যায়েই নারী উদ্যোক্তা হওয়ার পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, কারণ আধুনিক উদ্যোক্তা কার্যক্রম প্রায়শই প্রযুক্তি-নির্ভর দক্ষতা দাবি করে।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) যৌথভাবে নারীদের জন্য বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করেছে। SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর মতো প্রকল্পগুলো নারীদের দর্জি, বিউটিফিকেশন, হস্তশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রদানে সফল হলেও, উচ্চ-প্রযুক্তির ক্ষেত্র যেমন আইটি, রোবোটিক্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স বা উন্নত কারিগরি শিল্পে তাদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। NSDA এর তথ্যানুসারে, গত বছর সমাপ্ত হওয়া দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী মোট নারীর প্রায় ৭০% ঐতিহ্যবাহী বা সেবা খাতের প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিল, যেখানে উচ্চ-প্রযুক্তির প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫%। এটি নির্দেশ করে যে, বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য এবং নারীদেরকে আধুনিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ও কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। শুধুমাত্র সাধারণ দক্ষতা প্রদানের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; বরং তাদের এমন দক্ষতা প্রদান করতে হবে যা তাদের উচ্চ-আয়ের কর্মসংস্থান বা উদ্ভাবনী উদ্যোগে আত্মনিয়োগে সহায়তা করবে।

এই সীমাবদ্ধতাগুলো নারীদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উদ্ভাবনী দক্ষতার অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের গণ্ডি পেরিয়ে বড় পরিসরে বা প্রযুক্তি-নির্ভর উদ্যোগে প্রবেশ করতে পারছেন না। যদিও সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করেছে, কিন্তু প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু এবং বাজার চাহিদার মধ্যে অসঙ্গতি থাকায় তার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলস্বরূপ, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের পরও নারীদের একটি বড় অংশ হয় অনুন্নত খাতে কাজ করছে অথবা তাদের অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারছে না, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি বড় বাধা।

খাত ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে নারী শিক্ষার্থীর হার (আনুমানিক) ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে নারী শিক্ষার্থীর হার (আনুমানিক) NSDA পরিচালিত উচ্চ-প্রযুক্তির প্রশিক্ষণে নারী অংশগ্রহণ (২০২২-২৩)
বিশ্ববিদ্যালয় (সামগ্রিক) ৩৮% ৪৫% প্রযোজ্য নয়
প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৮% ২৩% প্রযোজ্য নয়
কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট ২৫% ৩২% প্রযোজ্য নয়
SEIP আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ৫০% (মোট প্রশিক্ষণার্থী) ৫২% (মোট প্রশিক্ষণার্থী) ১৫% (উচ্চ-প্রযুক্তির)

উৎস: UGC, BANBEIS, NSDA ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে (আনুমানিক উপাত্ত)।

সুপারিশ

  • UGC-কে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, বিশেষত STEM ও উচ্চ-প্রযুক্তি নির্ভর বিষয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা ও বৃত্তি চালু করার পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে নারীদের উৎসাহিত করতে একটি 'নারী উদ্ভাবক ফেলোশিপ প্রোগ্রাম' (Women Innovators Fellowship Program) প্রবর্তন করতে হবে। এর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা স্তরেই নারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উদ্ভাবনী মানসিকতা বিকাশে সহায়তা করা যাবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE)-কে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির বিষয়বস্তু পুনর্গঠন করতে হবে। 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০১১' এর আলোকে একটি নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যেখানে ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির মতো উচ্চ-চাহিদার ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের জন্য অন্তত ৪০% আসন সংরক্ষিত থাকবে। এই প্রশিক্ষণের সাথে সরাসরি শিল্প সংযোগ স্থাপন এবং কর্মসংস্থান বা উদ্যোগ স্থাপনে সহায়তা করার জন্য একটি 'পোস্ট-ট্রেনিং মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম' (Post-Training Mentorship Program) বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • Skills for Employment Investment Program (SEIP)-কে তাদের বর্তমান প্রশিক্ষণ মডিউলে একটি 'প্রযুক্তি-ভিত্তিক উদ্যোক্তা মডিউল' (Technology-based Entrepreneurship Module) যুক্ত করতে হবে, যা বিশেষভাবে নারী প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য ডিজাইন করা হবে। এই মডিউলে ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, এবং অনলাইন ব্যবসায়িক মডেল তৈরির উপর জোর দিতে হবে, যা তাদের ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে আধুনিক অনলাইন ভিত্তিক উদ্যোগে রূপান্তরে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, SEIP এর আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী উদ্যোক্তাদের জন্য 'ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) নীতি, ২০১৯' এর অধীনে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও বাজার সংযোগের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা পারভীন

রেহানা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষমতায়ন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator