প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) কর্তৃক প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন নিয়ে দেশব্যাপী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের...

সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) কর্তৃক প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন নিয়ে দেশব্যাপী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের মধ্যে যে আলোচনা ও বিতর্ক চলছে, তা কেবল একটি নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের এক প্রতিচ্ছবি। বিশেষত, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে ধাপে ধাপে চালু হওয়া এই 'যোগ্যতা-ভিত্তিক' (competency-based) শিক্ষাক্রমের প্রাথমিক প্রয়োগেই যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবনা এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে এখনো বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রণীত এই কারিকুলাম একদিকে যেমন মুখস্থ-নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, অন্যদিকে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, পর্যাপ্ত উপকরণের সংকট এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা এর সফল বাস্তবায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ পরিস্থিতি আমাদের সামনে এই মৌলিক প্রশ্নটি নিয়ে আসে: বর্তমান কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা কি কেবল নীতি প্রণয়নের ত্রুটি, নাকি শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত দুর্বলতার ফল?

নতুন শিক্ষাক্রমের মূল দর্শন হলো শিক্ষার্থীদেরকে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগের উপযোগী করে তোলা, যা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক নির্ধারিত দক্ষতা কাঠামোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এর লক্ষ্য হলো এমন এক প্রজন্ম তৈরি করা, যারা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। কিন্তু এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষকদের অপ্রতুল প্রশিক্ষণ এবং ধারণাগত স্পষ্টতার অভাব। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং NCTB নতুন কারিকুলামের বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করলেও, স্বল্প সময়ের এই প্রশিক্ষণগুলো প্রায়শই নতুন পদ্ধতি ও মূল্যায়ন কৌশল সম্পর্কে শিক্ষকদের মধ্যে পর্যাপ্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু প্রান্তিক বিদ্যালয়ে এখনো আধুনিক শিক্ষাদানের সরঞ্জাম ও ডিজিটাল ক্লাসরুমের অভাব প্রকট, যা যোগ্যতা-ভিত্তিক শিক্ষাক্রমের ব্যবহারিক প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া, পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের উপর জোর দেওয়ায় শিক্ষকদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক মূল্যায়নের পরিবর্তে কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনে পর্যবসিত হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, একটি যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায়োগিক দক্ষতার অভাব, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রায়শই তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করে থাকে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক জ্ঞান এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ না ঘটায়, উচ্চশিক্ষায় এসে শিক্ষার্থীরা প্রায়শই নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে এবং গবেষণা-ভিত্তিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হিমশিম খায়। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (Directorate of Technical Education) এর অধীনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় এনরোলমেন্ট বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণ শিক্ষার প্রতি অত্যধিক ঝোঁক এই ধারাকে এখনও মূল স্রোতে নিয়ে আসতে পারেনি। ফলে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষা থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও, তাদের একটি বড় অংশই শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতাসম্পন্ন হতে পারে না। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের বেকারত্ব বাড়ায় না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নীতিনির্ধারকরা বারবার কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এর প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে। শিক্ষাক্রমের মধ্যেই যদি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) ভিত্তিক প্রায়োগিক দক্ষতা এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা না যায়, তবে উচ্চশিক্ষায় এর প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

এই সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে, কারিকুলামের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও, এর কার্যকারিতা নির্ভর করে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতার উপর। কেবলমাত্র নীতি প্রণয়নের টেবিলে বসে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, বরং তা মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং নিরন্তর পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা আবশ্যক। NSDA এর পক্ষ থেকে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা মানদণ্ড নির্ধারণ করা হলেও, সেই মানদণ্ডগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষা ব্যবস্থার এই দুর্বলতাগুলো যদি দ্রুত সমাধান করা না হয়, তাহলে নতুন শিক্ষাক্রমও হয়তো তার কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে ব্যর্থ হবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। এই জটিলতাগুলো নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, BANBEIS, UGC, NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ অপরিহার্য।

শিক্ষাবর্ষ প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থী (লক্ষ) প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত
২০১৮ ১৭১.৬৯ ১০০.৬২ ১৩.৩২ ১:৩৪ ১:৩৩
২০১৯ ১৭১.৭৮ ১০৩.১২ ১৪.৫৯ ১:৩৩ ১:৩২
২০২০ ১৬৮.৬৪ ১০৪.৬৪ ১৫.৩০ ১:৩১ ১:৩১
২০২১ ১৬৬.৫৩ ১০৪.৮৩ ১৬.১২ ১:৩১ ১:৩০
২০২২ ১৬৪.৭২ ১০৫.৮৩ ১৭.৫৩ ১:৩০ ১:২৯

উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS), বার্ষিক শিক্ষা পরিসংখ্যান

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং NCTB কে নতুন যোগ্যতা-ভিত্তিক শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী পেশাগত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই পরিকল্পনায় NAPE (National Academy for Primary Education) এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষকদের এবং NAEM (National Academy for Educational Management) এর মাধ্যমে মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতির উপর বিশেষ জোর থাকবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং NSDA কে যৌথভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির জন্য পাঠ্যক্রমের মধ্যে ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর জন্য ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে বাধ্যতামূলক কারিগরি পরিচিতি কোর্স চালু করা যেতে পারে এবং মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ট্রেডের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা উচ্চশিক্ষায় কারিগরি ধারায় যেতে আগ্রহী হয় এবং শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়।
  • BANBEIS, UGC এবং NSDA এর সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী শিক্ষাক্রম মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করতে হবে, যা নিয়মিত বিরতিতে নতুন শিক্ষাক্রমের কার্যকারিতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করবে। এই কমিটি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি তিন বছর অন্তর শিক্ষাক্রমের প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করবে, যাতে শিক্ষাক্রমটি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে যুগোপযোগী থাকে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator