শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া গ্রামের ঐতিহাসিক শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দির অবশেষে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলার পর, মন্দিরটির করুণ অবস্থা ও সংরক্ষণের দাবি সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার পর, খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উদ্যোগ নিয়েছে এর সংস্কারকাজ শুরু করার। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল মন্দিরটি পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে বিশেষজ্ঞরা মন্দিরের বর্তমান কাঠামোগত অবস্থা, দেয়ালের কার্নিশ, পোড়ামাটির অলংকরণ এবং স্থাপনার বিভিন্ন জরাজীর্ণ অংশ ঘুরে দেখেন। মূল সংস্কার কাজ শুরু করার আগে প্রি-ডকুমেন্টেশনের গুরুত্ব তুলে ধরেন মো. মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রাচীন কোনো অবকাঠামো সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রি-ডকুমেন্টেশন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যাতে মূল রূপ ও ঐতিহ্যিক উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিশেষজ্ঞ টিম এনে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিস্তারিত নকশা ও উপাত্ত সংগ্রহের কাজ শুরু হবে শিগগিরই।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাপলা সিংহ মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ডিজিটাল সংরক্ষণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শুধু মূল ডিজাইন ফিরিয়ে আনলেই হবে না, বরং অতীত ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। উপকূলীয় নোনা এলাকায় আর্দ্রতার কারণে ভবনটি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ভবন সংস্কারের পাশাপাশি ৬০ বছরের তদূর্ধ্ব প্রবীণ স্থানীয় অধিবাসীদের অভিজ্ঞতা এবং মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা প্রয়োজন।
সংবাদ প্রকাশের পর দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও গবেষকদের পরিদর্শনে স্থানীয় বাসিন্দা, পূজারী এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে স্বস্তি ও আনন্দের সঞ্চার হয়েছে। মন্দিরের সভাপতি দেবপ্রিয় চৌধুরী এবং সেবাইত সুবপ্রসাদ চৌধুরী সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, দীর্ঘদিন অবহেলা ও মাদকসেবীদের উপদ্রবে ঐতিহ্যটি ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। গণমাধ্যমে খবর আসার পর প্রাথমিক পরিষ্কারের কাজ হয়েছে, এবং এখন পরিদর্শনের মাধ্যমে স্থায়ী সংস্কারের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মুখ দেখছে।
ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্র এবং অধ্যাপক মো. আবু নসরের গ্রন্থ অনুযায়ী, ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) প্রায় ৬০ ফুট উঁচু তিনতলা বিশিষ্ট এই শ্যামসুন্দর মন্দিরটি নির্মাণ করেন। মূল মন্দিরের পাশাপাশি এখানে দুর্গা ও শিব মন্দির এবং ‘জমির বিশ্বাসের পুকুর’ নামে ঐতিহাসিক দীঘি রয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সরাসরি পরিদর্শন, প্রি-ডকুমেন্টেশনের সিদ্ধান্ত এবং আগামী অর্থবছরে সংস্কার বাস্তবায়নের আশ্বাসে স্থানীয় বাসিন্দা ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। দ্রুত এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন ঘটে ঐতিহাসিক মন্দিরটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সচেতন মহল।