জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক গঠিত থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচির খসড়া নীতিমালায় জিনোমিক স্ক্রিনিং এবং প্রসবপূর্ব রোগ নির...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক গঠিত থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচির খসড়া নীতিমালায় জিনোমিক স্ক্রিনিং এবং প্রসবপূর্ব রোগ নির্ণয়কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবনা, বাংলাদেশের জন্য থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই পদক্ষেপটি শুধুমাত্র দেশের বিশাল থ্যালাসেমিয়া বাহক জনগোষ্ঠীকে শনাক্তকরণে সহায়ক হবে না, বরং উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বংশগত রোগের বিস্তার রোধে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে, ২০২২ সালের জাতীয় থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এর অধীনে পরিচালিত পাইলট প্রকল্পগুলো প্রাথমিক জিনোমিক পরীক্ষার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে, যা এই নীতিমালার ভিত্তি স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০-১২% থ্যালাসেমিয়ার বাহক, যা প্রায় ১.৫ কোটিরও বেশি মানুষ। প্রতি বছর প্রায় ৭,০০০ শিশু থ্যাসেলেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যা দেশের স্বাস্থ্যখাতে এক বিশাল বোঝা। এই রোগের প্রতিরোধে জিনোমিক্স প্রযুক্তি, বিশেষ করে প্রি-মারিটাল স্ক্রিনিং এবং প্রি-নেটাল ডায়াগনোসিস, অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। আইইডিসিআর (IEDCR) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সময়ে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে গবেষণা ও সার্ভে পরিচালনা করেছে, যেখানে দেখা গেছে যে সঠিক সময়ে জিনোমিক পরীক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ের অভাবে বহু পরিবারে বারবার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম হচ্ছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে, দম্পতিরা সন্তান ধারণের পূর্বেই তাদের বাহক অবস্থা জানতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করতে পারবেন। যদি উভয়ই বাহক হন, তবে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) এর মাধ্যমে প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক ডায়াগনোসিস (PGD) ব্যবহার করে সুস্থ ভ্রূণ নির্বাচন করা সম্ভব, যা থ্যালাসেমিয়া মুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশ্চিত করতে পারে। বর্তমানে, এই ধরনের উন্নত প্রযুক্তি বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে উপলব্ধ হলেও, জাতীয় পর্যায়ে এর বিস্তার ঘটাতে পারলে থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র রোগ নির্ণয়ে সীমাবদ্ধ নয়, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের জীবনমান উন্নয়নেও এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। স্টেম সেল থেরাপি এবং জিন থেরাপি, যা বিশ্বব্যাপী থ্যালাসেমিয়ার স্থায়ী নিরাময়ে আশার আলো দেখাচ্ছে, বাংলাদেশেও এর গবেষণা ও প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও এই প্রযুক্তিগুলো ব্যয়বহুল এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে এর প্রসারের পথ সুগম হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) এর অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বায়োটেকনোলজি পণ্যের গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। বর্তমানে, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন এবং আয়রন চিলেশন থেরাপির উপর নির্ভর করতে হয়, যা জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া এবং এর সাথে যুক্ত রয়েছে নানা ধরনের জটিলতা ও উচ্চ ব্যয়। জিনোমিক্স ভিত্তিক ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি ভবিষ্যতে রোগীদের জন্য আরও কার্যকর এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা বিকল্প তৈরি করতে পারে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ কমাবে। এই প্রযুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি ও নৈতিক কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য।

সূচক ২০১৫ ২০২০ ২০২৩
থ্যালাসেমিয়া বাহকের অনুমিত হার (শতাংশ) ৯.৮% ১০.৫% ১০.৮%
প্রতি বছর জন্ম নেওয়া থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা (আনুমানিক) ৬,৫০০ ৬,৮০০ ৭,১০০
থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের আওতাভুক্ত জেলা (সংখ্যা) ২ ৫ ৭
জিনোমিক সিকোয়েন্সিং ল্যাবের সংখ্যা (সরকারি) ০ ১ ২

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং আইইডিসিআর (IEDCR) এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও গবেষণা পত্র।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রস্তাবিত থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচির খসড়া নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করে এবং "জাতীয় থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ আইন" প্রণয়নের মাধ্যমে প্রি-মারিটাল ও প্রি-নেটাল জিনোমিক স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হোক। এই আইন DGHS এর অধীনে সকল সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করবে।
  • IEDCR এবং NIMH সহ দেশের প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে থ্যালাসেমিয়া এবং অন্যান্য বংশগত রোগের জিনোমিক গবেষণায় আরও বেশি তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হোক। DGDA এর সাথে সমন্বয় করে জিন থেরাপি ও স্টেম সেল থেরাপির মতো উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং স্থানীয় উৎপাদন সুবিধার জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক, যা এ ধরনের প্রযুক্তির দ্রুত ও নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।
  • ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় DGHS একটি কেন্দ্রীয় জিনোমিক ডাটাবেস তৈরি করবে, যেখানে থ্যালাসেমিয়া বাহক এবং আক্রান্ত রোগীদের তথ্য সুরক্ষিত থাকবে। এই ডাটাবেস গবেষণার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং MOHFW এর অধীনে জাতীয় থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে দম্পতিদের জন্য বিনামূল্যে জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনে IVF ও PGD এর মতো উন্নত প্রজনন প্রযুক্তির সুবিধা সহজলভ্য করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator