জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের… | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নতুন সংঘাত

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নতুন সংঘাত
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নতুন সংঘাত
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে সাইবার নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ...

সম্প্রতি, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে সাইবার নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতার সাইবার আক্রমণ (state-sponsored cyber attacks) এবং তথাকথিত 'হাইব্রিড যুদ্ধ' (hybrid warfare) আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষত, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে সাইবার আক্রমণ পরিচালনার অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ, সাইবার স্পেসে প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতাগুলোকে প্রকটভাবে তুলে ধরেছে। এই পরিস্থিতিতে, রাষ্ট্রসমূহের ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের একটি নতুন সংঘাতপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সর্বসম্মত আইনি কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তাকে তীব্র করেছে।

সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। এই ধরনের আক্রমণ প্রায়শই সনাক্ত করা কঠিন, কারণ আক্রমণকারীরা ছদ্মবেশ ধারণ করে বা তৃতীয় পক্ষের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের উৎস গোপন রাখে। আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে জাতিসংঘের সনদ, সামরিক আগ্রাসন এবং বলপ্রয়োগের ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে 'বলপ্রয়োগ' বা 'সশস্ত্র আক্রমণ'-এর সংজ্ঞা কী হবে, তা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এখনো কোনো স্পষ্ট ঐকমত্য নেই। উদাহরণস্বরূপ, যখন একটি সাইবার আক্রমণ একটি রাষ্ট্রের ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি করে বা বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন বিপন্ন করে তোলে, তখন কি সেটি জাতিসংঘের ৭ম অনুচ্ছেদের অধীনে 'সশস্ত্র আক্রমণ' হিসেবে বিবেচিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট। Tallin Manual 2.0-এর মতো বিশেষজ্ঞ দলিলগুলো এই বিষয়ে কিছু নির্দেশিকা প্রদান করলেও, সেগুলো রাষ্ট্রগুলোর জন্য আইনত বাধ্যতামূলক নয়। ফলস্বরূপ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলো প্রায়শই সাইবার হামলার প্রতিক্রিয়ায় কূটনৈতিক প্রতিবাদ বা সীমিত পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকে, যা বৃহত্তর সাইবার সংঘাত প্রতিরোধের জন্য অপর্যাপ্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে, সার্ক (SAARC) অঞ্চলের দেশগুলো, যারা ডিজিটাল অবকাঠামোতে তুলনামূলকভাবে নতুন, তাদের জন্য এই ধরনের সাইবার হুমকির মুখে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং একটি সমন্বিত আইনি প্রতিক্রিয়া তৈরি করা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার মূলে রয়েছে একটি রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে তার কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে এবং কোনো বিদেশি শক্তি তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু সাইবার স্পেসের প্রকৃতি ভৌগোলিক সীমানাকে অতিক্রম করে। একটি সাইবার আক্রমণ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে পরিচালিত হতে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, জাতিসংঘকে তার UN Peacekeeping কার্যক্রমের মতো সাইবার স্পেসেও একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করার কথা ভাবতে হচ্ছে। যেমন, সাইবার হামলা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান বা সাইবার সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা। BIMSTEC সদস্য রাষ্ট্রগুলো যেমন বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য যৌথ সাইবার ড্রিল এবং তথ্য বিনিময়ের উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এই উদ্যোগগুলো ইতিবাচক, তবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় একটি কার্যকর ও বাধ্যতামূলক কাঠামো ছাড়া, রাষ্ট্রগুলো সাইবার হামলার শিকার হলে তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা পাবে না। বর্তমানে, সাইবার অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিদ্যমান থাকলেও, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সাইবার হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক ফোরামের কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক নতুন জটিলতা।

সংস্থা/উদ্যোগ কার্যক্রমের প্রকৃতি ২০২৩-২৪ সালের মূল অর্জন/ফলাফল রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর প্রভাব
জাতিসংঘ (UN) সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা, বিশেষজ্ঞ গ্রুপ গঠন জাতিসংঘের ওপেন-এন্ডেড ওয়ার্কিং গ্রুপ (OEWG) সাইবার নিরাপত্তার জন্য আচরণবিধি সংক্রান্ত প্রস্তাবনা পেশ করেছে। সাইবার স্পেসে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নির্ধারণে প্রাথমিক ধাপ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ) আন্তর্জাতিক ফোরামে সাইবার নিরাপত্তা নীতিতে অংশগ্রহণ জাতিসংঘের OEWG এবং GGE-তে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সাইবার কূটনীতিকে গুরুত্ব প্রদান। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং সাইবার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক নীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
BIMSTEC আঞ্চলিক সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাইবার হুমকি মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় চুক্তি এবং যৌথ সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মশালা আয়োজন। আঞ্চলিক সাইবার স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর অভাব।
UN Peacekeeping সাইবার স্পেসে তথ্য সুরক্ষা ও অবকাঠামো সুরক্ষা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ডিজিটাল ডেটা সুরক্ষা এবং সাইবার হামলা থেকে মিশনগুলোর অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক রক্ষায় নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন। শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর সাইবার স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো সুরক্ষায় পরোক্ষ প্রভাব।
সার্ক (SAARC) সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ফ্রেমওয়ার্ক সাইবার অপরাধ দমনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি আইনি কাঠামো প্রণয়নের আলোচনা চলছে, যদিও অগ্রগতি ধীর। সাইবার অপরাধ দমনে আঞ্চলিক সহযোগিতা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর সাইবার অপরাধের প্রভাব কমাতে সক্ষমতা বৃদ্ধি।

উৎস: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, BIMSTEC ও সার্ক সচিবালয়ের প্রকাশনা।

সুপারিশ

  • জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে (UN General Assembly) সাইবার স্পেসে রাষ্ট্রীয় আচরণ সংক্রান্ত একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি (International Treaty on State Conduct in Cyberspace) প্রণয়নের জন্য দ্রুত একটি আন্তঃসরকারি বিশেষজ্ঞ কমিটি (Intergovernmental Expert Committee) গঠন করতে হবে, যা সাইবার হামলাকে 'বলপ্রয়োগ' বা 'সশস্ত্র আক্রমণ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।
  • জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে (UN Security Council) সাইবার হামলা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমর্থন জানাতে এবং সম্ভাব্য সাইবার সংঘাত নিরসনে 'জাতিসংঘ সাইবার প্রতিক্রিয়া বাহিনী' (UN Cyber Response Force) বা 'জাতিসংঘ সাইবার মধ্যস্থতা ইউনিট' (UN Cyber Mediation Unit) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা সামরিক শান্তিরক্ষা মিশনের মতো সাইবার স্পেসেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
  • আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (International Criminal Court) বা একটি নতুন প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাইবার বিচারিক ফোরামকে (International Cyber Judicial Forum) রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মারাত্মক সাইবার হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা সত্তাদের বিচার করার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে, যাতে সাইবার স্পেসে রাষ্ট্রগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator