গত ১লা অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের বিতর্কিত কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) বা কার্বন শুল্কের অন্তর্বর্তীকালীন বাস্তবায়ন শুরু করেছে, যা বিশ্ববাণিজ্যে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে। প্রাথমিকভাবে সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সার, বিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেন – এই ছয়টি খাতে প্রযোজ্য হলেও, ইইউর পরিবেশগত নীতি বিষয়ক ডিরেক্টরেট-জেনারেলের সাম্প্রতিক আলোচনা ইঙ্গিত দেয় যে ২০২৬ সাল নাগাদ এর আওতা তৈরি পোশাক শিল্পের মতো অন্যান্য শ্রম-নিবিড় খাতেও সম্প্রসারিত হতে পারে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য, যারা ইইউতে তৈরি পোশাকের বৃহত্তম রপ্তানিকারকদের মধ্যে অন্যতম, এক গভীর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে।
ইইউর এই কার্বন শুল্ক বিশ্ববাণিজ্যকে তাদের জলবায়ু কূটনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে, যেখানে পরিবেশগত মান পূরণে ব্যর্থ দেশগুলোর পণ্যকে শুল্কের আওতায় এনে 'কার্বন লিকেজ' বা কার্বন নিঃসরণ অন্যত্র স্থানান্তরের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই নীতি ইইউর 'গ্রিন ডিল' এজেন্ডার একটি স্তম্ভ, যা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমাতে সদস্য দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইইউর এই পদক্ষেপকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ব্রাসেলসে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, এটি কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু শাসন ব্যবস্থায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও বটে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি জটিল কারণ, ইইউর বাজার বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি ধারণ করে। CBAM-এর সম্ভাব্য সম্প্রসারণ বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যদি না দেশটি দ্রুত নিজেদের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এবং সার্ক (সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন)-এর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি সম্মিলিত কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তৈরি করে ইইউর ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে, যাতে CBAM-এর শর্তাবলী উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও নমনীয় হয় অথবা প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহায়তা প্রদান করা হয়।
| খাত | ইইউর মোট কার্বন নিঃসরণে খাতের অবদান (আনুমানিক %) | CBAM এর আওতায় আসার সম্ভাব্য সাল | বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট রপ্তানি খাতে ইইউর অংশ (২০২২) |
|---|---|---|---|
| লোহা ও ইস্পাত | ১৪% | ২০২৬ | ১.২% |
| সিমেন্ট | ৬% | ২০২৬ | ০.৫% |
| অ্যালুমিনিয়াম | ১% | ২০২৬ | ০.৮% |
| তৈরি পোশাক | (পরোক্ষভাবে, সাপ্লাই চেইন) | ২০৩০ এর পূর্বে (প্রস্তাবিত) | ৪৫.৬% |
| সার | ১% | ২০২৬ | ০.১% |
উৎস: ইউরোপীয় কমিশন, WTO, বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)
সুপারিশ
- বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইইউর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনা আরও জোরদার করতে হবে, বিশেষ করে UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্ব এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে CBAM-এর অধীনে তৈরি পোশাকের জন্য বিশেষ ছাড় বা দীর্ঘমেয়াদী রূপান্তরকাল নিশ্চিত করার জন্য।
- BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একটি সম্মিলিত কূটনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করতে হবে, যেখানে এই অঞ্চলের দেশগুলো একযোগে ইইউর কাছে CBAM-এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করবে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি তহবিল গঠনের দাবি জানাবে।
- দেশীয় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট "জাতীয় কার্বন হ্রাস কৌশলপত্র" প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রচলন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।