জাহাজ ভাঙা শিল্পের 'গ্রিন রিসাইক্লিং' চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের 'গ্রিন রিসাইক্লিং' চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের 'গ্রিন রিসাইক্লিং' চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
জাহাজ ভাঙা শিল্পের 'গ্রিন রিসাইক্লিং' চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা বৈশ্বিক জাহাজ ভাঙা কার্যক্রমের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লি...

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা বৈশ্বিক জাহাজ ভাঙা কার্যক্রমের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বিধিমালা ২০২২ (Bangladesh Ship Recycling Rules 2022) কার্যকর করা হয়েছে। এই বিধিমালাটি বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পকে হংকং কনভেনশন (Hong Kong International Convention for the Safe and Environmentally Sound Recycling of Ships, 2009 - HKC) এর মানদণ্ডে উন্নীত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যদিও এই অগ্রগতি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, তবে পরিবেশবান্ধব বা 'গ্রিন রিসাইক্লিং' এর চ্যালেঞ্জগুলো এখনো প্রকট। বিশেষত, কর্মপরিবেশের সুরক্ষা, বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য একটি চলমান সংগ্রাম। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই শিল্পকে আরও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করতে সহায়তার প্রস্তাব দিলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনো ধীরগতির। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ২০১৩ সালে 'Ship Breaking and Recycling Project' এর অধীনে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা অনুমোদন করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল পরিবেশগত ও শ্রম সুরক্ষা মান উন্নত করা, কিন্তু এর সম্পূর্ণ সুফল এখনও অধরা।

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক সরাসরি জড়িত। তবে, এই শিল্পটি দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশ দূষণ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির জন্য সমালোচিত হয়ে আসছে। পুরনো জাহাজগুলো ভাঙার সময় অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs), ভারী ধাতু এবং তেল জাতীয় বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশে নির্গত হয়, যা মাটি, পানি এবং বায়ুকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রণীত কঠোর বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রেই এর যথাযথ প্রয়োগের অভাব দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার জাহাজ ভাঙা আইন, ২০১৮ (Bangladesh Ship Recycling Act 2018) এবং এর অধীনস্থ বিধিমালা প্রণয়ন করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই আইনে জাহাজ ভাঙার জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। তবে, পর্যাপ্ত আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে অনেক প্লটই এই নির্দেশনাগুলো পুরোপুরি মানতে পারছে না। ফলস্বরূপ, বিষাক্ত বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশে মিশে যাচ্ছে, যা উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি সৃষ্টি করছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে এবং কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়নের মাধ্যমে এই খাতের পরিবেশগত ও সামাজিক মান উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তবে এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব এখনো সীমিত।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এবং 'গ্রিন রিসাইক্লিং' এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। বর্তমানে, বেশিরভাগ জাহাজ ভাঙার কাজই ম্যানুয়ালি বা সীমিত যন্ত্রপাতির সাহায্যে করা হয়, যা শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আধুনিক 'গ্রিন রিসাইক্লিং' প্রোটোকল অনুযায়ী, জাহাজ ভাঙার পূর্বে সমস্ত বিপজ্জনক পদার্থ জাহাজেই অপসারণ করা উচিত, যা 'আপস্ট্রিম ক্লিনিং' নামে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এটি প্রায়শই সম্ভব হয় না, কারণ বেশিরভাগ জাহাজই এই ধরনের পূর্ব-প্রস্তুতি ছাড়াই আসে। উপরন্তু, বিপজ্জনক বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক সুবিধা এবং এর নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত প্ল্যান্টের অভাব রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। World Bank এর 'Bangladesh Environmental Sustainability and Transformation (BEST)' প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো পরোক্ষভাবে এই শিল্পের পরিবেশগত মান উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে, যেখানে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয়েছে। তবে, সরাসরি জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট ও বৃহৎ আকারের বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত নয়। এই শিল্পের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য, কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এর কার্যকর প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

সূচক ২০১৪ ২০১৮ ২০২২
জাহাজ ভাঙা প্লটের সংখ্যা (আনুমানিক) ১৪০ ১৫০ ১৬০
বার্ষিক ভাঙা জাহাজের পরিমাণ (মিলিয়ন LDT) ৬.৫ ১০.০ ১৩.৫
এইচকেসি (HKC) অনুবর্তী প্লটের সংখ্যা ০ ৫ ২৮
শ্রমিক দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যু (প্রতি বছর, আনুমানিক) ৩৪ ২২ ১৩
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সহায়তা (মিলিয়ন ডলার) ৩৫ (অনুমোদিত) ১৫ (ব্যয়িত) ২৫ (ব্যয়িত)

উৎস: বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSBRA), ওয়ার্ল্ড ব্যাংক রিপোর্টস, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বিধিমালা ২০২২ এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়) কর্তৃক নিয়মিত ও কঠোর পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করা এবং বিধিমালা লঙ্ঘনের জন্য তাৎক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কার্যকর করা।
  • ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় জাহাজ ভাঙা প্লটগুলোতে অত্যাধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো (যেমন - অ্যাসবেস্টস ও পিসিবিস নিষ্ক্রিয়করণ প্ল্যান্ট, তেল ও রাসায়নিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট) স্থাপন করা এবং এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের জন্য শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা, যার মাধ্যমে জাহাজ ভাঙা প্লটগুলোকে 'গ্রিন রিসাইক্লিং' মানদণ্ডে উন্নীত করার জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি প্রদান করা হবে, বিশেষত হংকং কনভেনশন (HKC) এর প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য আপস্ট্রিম ক্লিনিং এবং নিরাপদ ডকিং সুবিধা উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator