প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: মুখস্থের বেড়াজাল নাকি সৃজনশীলতার মুক্ত প্রাঙ্গণ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: মুখস্থের বেড়াজাল নাকি সৃজনশীলতার মুক্ত প্রাঙ্গণ?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: মুখস্থের বেড়াজাল নাকি সৃজনশীলতার মুক্ত প্রাঙ্গণ?
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: মুখস্থের বেড়াজাল নাকি সৃজনশীলতার মুক্ত প্রাঙ্গণ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত নতুন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশ...

সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত নতুন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশের শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া এবং মুখস্থনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগটি একদিকে যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি এর বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা সংশয়। এই নতুন কারিকুলাম কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার দুয়ার খুলে দেবে, নাকি প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে এটিও মুখস্থের বেড়াজালে আটকা পড়বে – এ প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

নতুন শিক্ষাক্রমে প্রথাগত পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের শিখনকালীন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি’র তথ্য অনুযায়ী, এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তাদের দক্ষতা, মনোভাব ও মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করবে। মুখস্থনির্ভরতা হ্রাস করে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং দলগত কাজের মাধ্যমে শিখনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে, এর সফল বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ। দেশের প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষককে এই নতুন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর সর্বশেষ তথ্যমতে, অনেক শিক্ষকেরই আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি এবং ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব রয়েছে, যা নতুন কারিকুলামের উদ্দেশ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য যে ধরনের মুক্ত আলোচনা, বিতর্ক ও প্রকল্পভিত্তিক কাজের পরিবেশ প্রয়োজন, তা অনেক বিদ্যালয়েই অনুপস্থিত। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যাধিক্য এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এই নতুন পদ্ধতির কার্যকারিতা হ্রাস করতে পারে।

নতুন শিক্ষাক্রমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতিও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে, যা ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ)-এর ভিশন ২০৪১-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অষ্টম শ্রেণি থেকে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত কারিগরি শিক্ষকের অভাব এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় প্রতিবন্ধকতা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর আওতাধীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা ও বিশেষায়িত কোর্স চালু করা প্রয়োজন, যাতে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করে তোলা যায়। শুধুমাত্র সিলেবাস পরিবর্তন করলেই হবে না, শিক্ষকদের মননশীলতার পরিবর্তন এবং তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য। পাশাপাশি, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করাও অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতির বাইরে গিয়েও শিক্ষার্থীদের শিখনের গুরুত্ব বুঝতে পারেন।

প্রতিষ্ঠানের নাম মোট শিক্ষক (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক (নতুন কারিকুলাম) শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (জাতীয় গড়)
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ৩,৫৬,২৫৫ ১,৫০,০০০ (প্রথম ধাপ) ১:৩৪
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ২,৬১,৫৭৭ ১,২০,০০০ (প্রথম ধাপ) ১:২৯
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ১৩,৩৪৩ ৫,০০০ (প্রারম্ভিক) ১:১৮

উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২০২২-২০২৩

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবিলম্বে এনসিটিবি-এর সাথে সমন্বয় করে একটি ব্যাপক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষককে নতুন কারিকুলামের শিখনফল, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, এবং প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা নিরূপণে নিয়মিত ফলো-আপ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করবে।
  • ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি পূরণে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে, যেখানে শিল্প খাতের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা অনুষদ ও গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করা হবে, যাতে তারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন এবং মূল্যায়ন কৌশল বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করতে পারে এবং শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator