শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস: বিনিয়োগকারীর আস্থা সংকট না বাজারের স্থিতিশীলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস: বিনিয়োগকারীর আস্থা সংকট না বাজারের স্থিতিশীলতা?

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস: বিনিয়োগকারীর আস্থা সংকট না বাজারের স্থিতিশীলতা?
শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস: বিনিয়োগকারীর আস্থা সংকট না বাজারের স্থিতিশীলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যসীমা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিনিয়...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যসীমা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে BSEC এর ৭৫৭তম কমিশন সভায় গৃহীত এই পদক্ষেপটি একদিকে যেমন বাজারের পতন ঠেকাতে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে তারল্য সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার অভাব তৈরি করছে বলে সমালোচনা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘসময় ধরে মন্দাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলছে।

ফ্লোর প্রাইস প্রবর্তনের পেছনের মূল যুক্তি ছিল বাজারের অস্বাভাবিক পতন রোধ করা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পুঁজি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অতীতে, বিশেষ করে ২০২০ সালের মার্চ মাসে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাবের সময় এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালের জুলাই মাসে, BSEC বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল। এই পদক্ষেপের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সূচকের পতন রোধ করা গেলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) উভয় ক্ষেত্রেই লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতাকে ব্যাহত করছে। অনেক শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকায় ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে বিনিয়োগকারীরা চাইলেও তাদের শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না, যা এক ধরনের কৃত্রিম তারল্য সংকট তৈরি করেছে। এটি বিনিয়োগকারীদের পুঁজি আটকে রাখছে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্লোর প্রাইস একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা যা বাজারের প্রকৃত চাহিদা ও যোগানের নীতিকে লঙ্ঘন করে। যখন কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম তার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি থাকে এবং ফ্লোর প্রাইস সেই উচ্চ মূল্যকে ধরে রাখে, তখন বিনিয়োগকারীরা ন্যায্য মূল্যে শেয়ার কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এর ফলস্বরূপ, বাজারের মূল্য আবিষ্কারের প্রক্রিয়া (price discovery mechanism) ব্যাহত হয়। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর থেকে নিষ্ক্রিয় বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (BO) অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনীহার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট এতটাই তীব্র হয়েছে যে, অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও নতুন করে বিনিয়োগে দ্বিধা করছেন, কারণ তারা জানেন যে ফ্লোর প্রাইসের কারণে ভবিষ্যতে শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে। এই পরিস্থিতি নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য পুঁজি উত্তোলনকেও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত।

সময়কাল DSE প্রধান সূচক (DSEX) DSE দৈনিক গড় লেনদেন (কোটি টাকা) ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকা শেয়ার (%)
জানুয়ারি ২০২৪ (ফ্লোর প্রবর্তনের পর) ৬,০০০ - ৬,৩০০ ৪০০ - ৬০০ ৬০-৭০%
ডিসেম্বর ২০২৩ (ফ্লোর প্রবর্তনের পূর্বে) ৬,৩০০ - ৬,৪৫০ ৮০০ - ১০০০ ১০-১৫%
জুলাই ২০২২ (ফ্লোর প্রবর্তনের পর) ৬,১০০ - ৬,২০০ ৫০০ - ৭০০ ৫০-৬০%
ফেব্রুয়ারি ২০২০ (ফ্লোর প্রবর্তনের পূর্বে) ৪,৫০০ - ৪,৬০০ ৩০০ - ৪০০ ২-৩%

উৎস: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কে একটি সুস্পষ্ট ও সময়াবদ্ধ 'এক্সিট স্ট্র্যাটেজি' ঘোষণা করা উচিত, যেখানে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের একটি রোডম্যাপ থাকবে। এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং বাজারের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) কে যৌথভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে যাতে অস্বাভাবিক লেনদেন এবং কারসাজি রোধ করা যায়, যা ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর বাজারের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর পাশাপাশি, বিনিয়োগ শিক্ষা কর্মসূচিতে আরও জোর দিতে হবে যাতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
  • সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে পুঁজিবাজারের তারল্য প্রবাহ বাড়ানোর জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেমন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য মার্জিন ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা। এতে করে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এর মাধ্যমে পরিচালিত বিও অ্যাকাউন্টগুলোতে নতুন করে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator