অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা: নীরব মহামারি রোধে জরুরি পদক্ষেপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা: নীরব মহামারি রোধে জরুরি পদক্ষেপ

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা: নীরব মহামারি রোধে জরুরি পদক্ষেপ
অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা: নীরব মহামারি রোধে জরুরি পদক্ষেপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের (Antimicrobial Resist...

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের (Antimicrobial Resistance - AMR) হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এই নীরব মহামারি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC) থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) মৃত্যুর হার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু চিকিৎসাব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং জনজীবনকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ব্যবহৃত প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর কার্যকারিতা প্রায় ৪০-৫০% হ্রাস পেয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে আমরা দ্রুতই এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে সাধারণ সংক্রমণও আরোগ্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং ভুল ডোজের প্রয়োগ। বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কেনার প্রবণতা এবং ডাক্তারদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সংস্কৃতি এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এর এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকট, সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে সৃষ্ট AMR-এর অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির ১.১% থেকে ৩.৮% পর্যন্ত হতে পারে। এই অর্থনৈতিক চাপ কেবল স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং উৎপাদনশীলতা হ্রাস, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিখাতে পশুপাখির দ্রুত বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের একটি বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত এক নির্দেশিকা অনুযায়ী, পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারির কথা বলা হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এখনও দুর্বল।

এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও উদ্বিগ্ন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'AMR Control in Asia and the Pacific' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমন্বিত এবং বহু-খাতভিত্তিক (One Health approach) কৌশল গ্রহণ জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, জনস্বাস্থ্য গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের দুর্বলতা এই সমস্যা সমাধানের পথে বড় বাধা। বাংলাদেশ সরকার 'জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ কৌশল ২০০৮' (National Antimicrobial Resistance Strategy 2008) প্রণয়ন করলেও, এর নবায়ন ও আধুনিকায়ন এবং কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও জনবলের অভাব রয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক অ্যান্টিবায়োটিকের উৎপাদন, বিতরণ ও বিক্রয়ে কঠোর নিয়মাবলী থাকলেও, অবৈধভাবে বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ঘটনা এখনও অহরহ ঘটছে। এর ফলে, সাধারণ মানুষ সঠিক ডোজ এবং সময়কাল সম্পর্কে অজ্ঞ থাকায় রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। উপরন্তু, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশেও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, যা পরবর্তীতে মানুষের খাদ্যচক্রেও প্রবেশ করতে পারে।

বছর নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের হার (%) (যেমন, E. coli-এর জন্য Ciprofloxacin) হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের কারণে মৃত্যুর হার (%) AMR নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি (%)
২০১৯ ৫৫ ১০.২ ২.৫
২০২০ ৬২ ১২.৫ ৩.১
২০২১ ৬৭ ১৪.৮ ২.৮
২০২২ ৭৩ ১৬.৩ ৩.৫
২০২৩ ৭৮ ১৮.৫ ৪.২

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর সম্মিলিত ডেটা বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • 'অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ কৌশল ২০০৮' কে অবিলম্বে যুগোপযোগী করে 'জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ আইন' প্রণয়ন করা এবং এর অধীনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (DGDA) শক্তিশালী করে অ্যান্টিবায়োটিকের উৎপাদন, বিতরণ, প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রয় এবং কৃষি ও পশুপালনে এর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে World Bank ও ADB-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় দেশব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নজরদারি (AMR Surveillance) প্রোগ্রাম জোরদার করতে হবে। এর মাধ্যমে হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য একটি সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেস স্থাপন করা, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার ও AMR-এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা। পাশাপাশি, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ব্যাপক জনসচেতনতা অভিযান পরিচালনা করা, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক সম্পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করার গুরুত্ব এবং প্রেসক্রিপশন ছাড়া এর ব্যবহার পরিহারের উপর জোর দেওয়া হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator