চীনের 'ঋণ কূটনীতি': দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর কৌশলগত ফাঁদ? | আই নিউজ বিডি

চীনের 'ঋণ কূটনীতি': দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর কৌশলগত ফাঁদ?

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
চীনের 'ঋণ কূটনীতি': দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর কৌশলগত ফাঁদ?
চীনের 'ঋণ কূটনীতি': দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর কৌশলগত ফাঁদ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংসের কাছে লিজ দেওয়া হয়, যা চীনের 'ঋ...

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংসের কাছে লিজ দেওয়া হয়, যা চীনের 'ঋণ কূটনীতি'র একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হয়েছে। এই ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়ার ছোট অর্থনীতিগুলোর উপর চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এর কৌশলগত পরিণতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ শ্রীলঙ্কার মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২০ শতাংশই চীনের কাছে পাওনা। এই পরিস্থিতি কেবল শ্রীলঙ্কা নয়, বরং নেপাল, মালদ্বীপ এবং এমনকি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্যেও একটি সতর্কবার্তা, যারা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাপক ঋণ গ্রহণ করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীনের এই ঋণ প্রদানের কৌশল কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক লেনদেন নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা। চীন তার 'ঋণ কূটনীতি'র মাধ্যমে এই অঞ্চলে নিজের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, মালদ্বীপের বর্তমান সরকার চীনা ঋণ পরিশোধের বোঝায় জর্জরিত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বেইজিংয়ের সাথে ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা করেছে, যেখানে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের চীনা ঋণ পরিশোধের চাপ মালদ্বীপের জিডিপির প্রায় অর্ধেক। এই ঋণগুলো মূলত বন্দর নির্মাণ, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং আবাসন প্রকল্পের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়েছে, যা প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। নেপালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়; দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান চীন এবং ভারতের মধ্যে একটি বাফার রাষ্ট্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, এবং চীন সেখানে রেলওয়ে ও সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এই বিনিয়োগগুলো যদিও নেপালের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক, তবে ঋণের শর্তাবলী এবং পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই দেশগুলো প্রায়শই ঋণের ফাঁদে পড়ে এমন সব চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে, যা তাদের সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

চীনের এই কৌশলগত পদক্ষেপগুলো কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে যারা বিআরআই প্রকল্পের অধীনে উচ্চ হারে ঋণ নিয়েছে, তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে (UN Peacekeeping) দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ ঐতিহ্যগতভাবে উল্লেখযোগ্য, তবে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব তাদের আন্তর্জাতিক ফোরামে চীনের অবস্থানকে সমর্থন করার প্রবণতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদিও সার্ক (SAARC) এবং বিমসটেক (BIMSTEC)-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে চীনের ঋণ কূটনীতি এই সংস্থাগুলোর কার্যকারিতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। কারণ, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চীনের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ঐক্যবদ্ধ কৌশল গঠনে বাধা দিচ্ছে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং নেপালের মতো দেশগুলো চীনের সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায়, তারা প্রায়শই ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতি দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে, যেখানে অর্থনৈতিক নির্ভরতা কৌশলগত মিত্রতায় রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

দেশ চীনা ঋণের পরিমাণ (আনুমানিক বিলিয়ন USD) মোট বৈদেশিক ঋণের শতাংশ (২০২৪) উল্লেখযোগ্য প্রকল্প
শ্রীলঙ্কা ৭.৯ প্রায় ২০% হাম্বানটোটা বন্দর, কলম্বো পোর্ট সিটি
পাকিস্তান ৬৭.২ প্রায় ৩০% চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)
মালদ্বীপ ৩.১ প্রায় ৫০% ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, সিনামাল ব্রিজ
নেপাল ০.৫ প্রায় ১০% পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ট্রান্স-হিমালয়ান রেলওয়ে
বাংলাদেশ ১৮.৭ প্রায় ১০% পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল

উৎস: বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান (২০২৩-২৪ সালের তথ্য সংকলিত)

সুপারিশ

  • দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকে একটি সমন্বিত 'আঞ্চলিক ঋণ পর্যবেক্ষণ সংস্থা' (Regional Debt Monitoring Agency) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা সার্ক বা বিমসটেক সচিবালয়ের অধীনে কাজ করবে। এই সংস্থা সদস্য দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণের শর্তাবলী, সুদের হার এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো নিয়মিত বিশ্লেষণ করে একটি উন্মুক্ত ডেটাবেস তৈরি করবে, যাতে দেশগুলো ঋণ গ্রহণের আগে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পায় এবং 'ঋণ ফাঁদ' এড়াতে পারে।
  • দেশগুলোকে 'বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা আইন' (Foreign Debt Management Act) প্রণয়ন ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যেখানে প্রতিটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ঋণ গ্রহণের পূর্বে সংসদীয় অনুমোদন, আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই (feasibility study) এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) বাধ্যতামূলক করা হবে। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশের 'পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬' এর আদলে একটি কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যা ঋণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
  • দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে যৌথভাবে 'বহুপাক্ষিক ঋণ পুনর্গঠন কাঠামো' (Multilateral Debt Restructuring Framework) গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্ব ব্যাংকের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আলোচনা শুরু করতে হবে। এই কাঠামো চীনের মতো একক ঋণদাতা দেশের প্রভাব কমানোর পাশাপাশি, ঋণগ্রস্ত দেশগুলোকে টেকসই উপায়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেবে এবং তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator