নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার সংকট | আই নিউজ বিডি

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার সংকট

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার সংকট
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জনআস্থা: রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার সংকট
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত দশ বছরে বাংলাদেশে নির্বাচনী ইশতেহারের পূর্ণাঙ্গ ...

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত দশ বছরে বাংলাদেশে নির্বাচনী ইশতেহারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের হার গড়ে ৩৫ শতাংশের বেশি নয়। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং জনআস্থার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মূলভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে, বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার থাকলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রায়শই ধীরগতিসম্পন্ন এবং ক্ষেত্রবিশেষে দৃশ্যমান অগ্রগতিহীন। এই পরিস্থিতি কেবল ভোটারদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে না, বরং সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি জবাবদিহিতার সংকট তৈরি করেছে, যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক ইশতেহারগুলো সাধারণত নির্বাচনের পূর্বে ভোটারদের আস্থা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তবে, নির্বাচনের পর এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রায়শই দৃশ্যমান অনীহা দেখা যায়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটদানের হার ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা পরোক্ষভাবে জনআস্থার অবনতিকেই নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছিল, সেখানে সর্বশেষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এই হার অনেক কম ছিল, যা ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি এক ধরনের অনাগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। এই অনাগ্রহের পেছনে ইশতেহারের অবাস্তবায়ন একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় দেখা যায়, ইশতেহারে এমন সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয় যা বাস্তবায়নযোগ্য নয় অথবা যার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাব রয়েছে। এর ফলে, জনগণ অনুভব করে যে তাদের ভোট কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র এবং তাদের চাওয়া-পাওয়াগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। এই অবস্থায়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে কেবল ভোট আদায়ের কৌশল হিসেবে দেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে ক্ষয় করছে।

জবাবদিহিতার এই সংকট কেবল ইশতেহারের অবাস্তবায়নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। World Bank-এর 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে 'Voice and Accountability' এবং 'Control of Corruption' সূচকে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি, বরং ক্ষেত্রবিশেষে অবনতি হয়েছে। এই সূচকগুলো সরাসরি জনআস্থা ও জবাবদিহিতার সাথে সম্পর্কিত। যখন সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি অবিশ্বাস জন্ম নেয়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সুশাসনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। ADB (Asian Development Bank) তার 'Country Partnership Strategy' নথিতে বাংলাদেশে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছে, উল্লেখ করেছে যে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জবাবদিহিতার অভাব অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এর ফলস্বরূপ, সরকারি প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্নীতির অভিযোগ বৃদ্ধি পায়, যা জনমনে আরও বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই চক্রাকার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দুর্বল করে তোলে এবং গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিগুলোকে ক্ষয় করে দেয়।

জাতীয় নির্বাচন মোট নিবন্ধিত ভোটার ভোটদানের হার (%) প্রধান দলগুলোর ইশতেহারের গড় বাস্তবায়ন হার (%)* World Bank WGI: Voice & Accountability Index (0-100)
২০০৮ (নবম) ৮,১০,৮৭,০৯৩ ৮৭.১৩ ৪৫ ২৮
২০১৪ (দশম) ৯,১৯,৬৫,১৬৭ ৪০.০০ ৩৪ ২৬
২০১৮ (একাদশ) ১০,৪১,০৪,০৪৮ ৮০.০০ ৩২ ২৭
২০২৪ (দ্বাদশ) ১১,৯৬,৮৯,২৮৯ ৪১.৮০ (পর্যালোচনাধীন) ২৬

উৎস: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC), টিআইবি (TIB) গবেষণা প্রতিবেদন*, World Bank (WGI)

সুপারিশ

  • নির্বাচনী ইশতেহারকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা: বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আইন' প্রণয়ন করা উচিত, যার অধীনে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এই আইনের অধীনে একটি স্বাধীন 'ইশতেহার নিরীক্ষা কমিটি' গঠন করা যেতে পারে, যা নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
  • গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা শক্তিশালীকরণে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। এর জন্য, তাদের বাজেট ও জনবল বৃদ্ধি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত 'দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪' এবং 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৭'-এর সংশোধনী দ্বারা সম্ভব।
  • জনগণের তথ্য অধিকার এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ: 'তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯' এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নাগরিকরা সরকারি কার্যক্রম এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তথ্য সহজে পেতে পারে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তাদের ওয়েবসাইটে ইশতেহারের অগ্রগতি এবং বাজেট বরাদ্দের বিস্তারিত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে বাধ্য করা উচিত, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator