স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: দুর্নীতির জালে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: দুর্নীতির জালে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন?

সাদমান সাকিব  avatar   
সাদমান সাকিব
স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: দুর্নীতির জালে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন?
স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: দুর্নীতির জালে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন?
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্নযাত্রা এখন কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন...

বাংলাদেশের 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্নযাত্রা এখন কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার মতো মৌলিক প্রশ্ন। 'আই নিউজ বিডি'-র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্মার্ট সিটি প্রকল্প এবং ডেটা প্রাইভেসি খাতে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু উদ্বেগজনক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে যেমন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর মতো যুগান্তকারী আইন প্রণীত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতা এবং আইসিটি খাতে ব্যাপক লুটপাটের চিত্র উঠে আসছে। এই দ্বিমুখী পরিস্থিতি ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে, যেখানে নাগরিকদের আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকাকে স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজউকের পূর্বাচল স্মার্ট সিটি প্রকল্প, ঢাকায় স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নারায়ণগঞ্জে ডিজিটাল ইউটিলিটি সার্ভিসের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে, এসব উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের বাস্তবায়নে উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ডেটা প্রাইভেসি সংক্রান্ত উদ্বেগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে ডেটা প্রাইভেসি এবং নিরাপত্তার বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে, যা নাগরিকদের নজরদারি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর আগেও ডেটা সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে তাদের পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি অস্পষ্ট ও এলোমেলোভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ করে অপব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছিল। একটি স্মার্ট শহরের মূল ভিত্তি হলো তথ্য ও প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার, কিন্তু এর সঙ্গে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকে, তাহলে তা নাগরিকদের জন্য সুবিধা নয়, বরং ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বয়ে আনবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের আড়ালে আইসিটি খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে জানিয়েছেন যে, 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ও 'স্মার্ট বাংলাদেশ' প্রকল্পগুলোতে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার সুফল জনগণ পুরোপুরি পায়নি এবং এসব দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত চলছে। এমনকি, একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে আইসিটি খাতকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইসিটি বিভাগের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও 'দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র' উঠে এসেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো বঙ্গোপসাগরে একটি 'অফশোর স্মার্ট সিটি' নির্মাণের প্রস্তাব। একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আইন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা কোনো জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ না করে এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই একটি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করেছিল। এই কনসোর্টিয়ামের একটি কোম্পানিতে কমিটির প্রধানের পরিবারের ৪২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, যা স্বার্থের সংঘাত এবং স্বচ্ছতার গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এ ধরনের ঘটনা স্মার্ট বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে।

অন্যদিকে, ডেটা প্রাইভেসি সুরক্ষায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে 'ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫' (Personal Data Protection Ordinance 2025) বা Personal Data Protection Act (PDPA) প্রণয়নের মাধ্যমে। এটি বাংলাদেশের প্রথম ডেটা সুরক্ষা আইনি কাঠামো, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ব্যক্তিগত উপাত্তকে ব্যক্তির মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই অধ্যাদেশ একটি জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স অথরিটি (NDGA) প্রতিষ্ঠার কথা বলে, যার দায়িত্ব হবে উপাত্ত জিম্মাদারদের নিবন্ধন, নিরীক্ষা এবং নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপ করা। এটি ডেটা বিষয়দের তথ্য অ্যাক্সেস, সংশোধন, সম্মতি প্রত্যাহার এবং তথ্য মুছে ফেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকার প্রদান করে। তবে, এই আইনের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এবং এর বিধানগুলো নিয়ে আরও গভীর আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। অতীতে, ২০২২ সালের 'ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট'-এর খসড়া নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিল যে এটি নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং কর্তৃপক্ষকে ব্যক্তিগত তথ্য অ্যাক্সেসের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দিতে পারে। এছাড়াও, ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নিরাপত্তার ত্রুটির কারণে কোটি কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা এবং ব্যাংকিং খাতে সাইবার হামলার বৃদ্ধি দেশের সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামোর দুর্বলতা ও সচেতনতার অভাবকে প্রকটভাবে তুলে ধরে ।

স্মার্ট সিটি প্রকল্প এবং ডেটা প্রাইভেসি একে অপরের পরিপূরক। স্মার্ট সিটি যত বেশি ডেটা-নির্ভর হবে, ডেটা সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তত বাড়বে। দুর্নীতির কারণে যদি স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে নিম্নমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় বা নিরাপত্তা প্রোটোকল উপেক্ষা করা হয়, তাহলে তা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। এই অনিয়মগুলো কেবল আর্থিক ক্ষতিই করে না, বরং ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি জনগণের বিশ্বাসকেও ভেঙে দেয়। যখন সরকার 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার কথা বলে, তখন এর সঙ্গে নাগরিকদের তথ্য নিরাপত্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। যদি এই মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়, তাহলে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' কেবল একটি স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, যা নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুবিধার পরিবর্তে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বয়ে আনবে।

সুপারিশ: স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতির মূলোৎপাটনে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং এর অধীনে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ (NDGA) গঠন করা অপরিহার্য, যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কঠোর স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা হবে। তৃতীয়ত, আইসিটি খাতে দুর্নীতির অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনিয়ম করার সাহস না পায়। চতুর্থত, নাগরিকদের মধ্যে ডেটা প্রাইভেসি ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের প্রচলন বাধ্যতামূলক করতে হবে। সবশেষে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং ডেটা সুরক্ষা আইনগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো তৈরি করা উচিত, যা নাগরিকদের অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির অপব্যবহার রোধ করবে।


🔎 অনুসন্ধানে: সাদমান সাকিব

সাদমান সাকিব, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি।

Nema komentara


News Card Generator