বিশেষজ্ঞ চোখে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: নিরাময় অযোগ্য রোগের হাতছানি ও আগাম প্রস্তুতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: নিরাময় অযোগ্য রোগের হাতছানি ও আগাম প্রস্তুতি

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
বিশেষজ্ঞ চোখে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: নিরাময় অযোগ্য রোগের হাতছানি ও আগাম প্রস্তুতি
বিশেষজ্ঞ চোখে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: নিরাময় অযোগ্য রোগের হাতছানি ও আগাম প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (MOHFW) অধীন রোগ নিয়ন্ত্র...

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (MOHFW) অধীন রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC) কর্তৃক আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এই আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ AMR বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, যা ক্যান্সারের বর্তমান মৃত্যুহারকেও ছাড়িয়ে যাবে। দেশের প্রধান সংক্রামক রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে বহু ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে, যা হাসপাতালগুলোতে জটিল সংক্রমণের চিকিৎসাকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে। বিশেষত, ই. কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস-এর মতো প্যাথোজেনগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক অশনি সংকেত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে AMR পরিস্থিতি বিশেষভাবে জটিল, কারণ এখানে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রির প্রবণতা ব্যাপক। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ফার্মেসিগুলোতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির হার উদ্বেগজনক। এছাড়া, পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে পোল্ট্রি, মৎস্য ও গবাদি পশুর খামারে রোগ প্রতিরোধ ও দ্রুত বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের একটি দীর্ঘদিনের প্রবণতা রয়েছে। এসব অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে এবং ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বিভিন্ন কাঁচা বাজার থেকে সংগৃহীত মুরগির মাংস, মাছ এবং দুধের নমুনায় মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে, যা সরাসরি খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে একসময় সাধারণ সর্দি-কাশি, মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) বা ছোটখাটো ক্ষতও নিরাময় অযোগ্য মারাত্মক ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে, কারণ প্রচলিত কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই তখন আর কাজ করবে না।

AMR-এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং ব্যয়বহুল নতুন ওষুধের প্রয়োজন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী, রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণের কারণে রোগীদের হাসপাতালে থাকার গড় সময় সাধারণ সংক্রমণের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ, যা চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) যদিও সরাসরি AMR নিয়ে কাজ করে না, তবে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা এবং নিরাময় অযোগ্য রোগের ভীতি মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মাত্রা বাড়াতে পারে, যা পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, AMR-এর কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে এবং লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট সীমিত এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহনের সক্ষমতা কম, সেখানে AMR-এর বিস্তার একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এটি কেবল শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমাজের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেবে, শিক্ষা ও কর্মজীবনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং সর্বোপরি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের গতিকে শ্লথ করে দেবে।

বছর ই. কোলাই-এর বিরুদ্ধে সিপ্রোফ্লক্সাসিনের প্রতিরোধ হার (%) ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া-এর বিরুদ্ধে সেফট্রিয়াক্সোনের প্রতিরোধ হার (%) স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস-এর বিরুদ্ধে মেথিসিলিনের প্রতিরোধ হার (%) মোট অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির পরিমাণ (লক্ষ ডোজ)
২০১৮ ৬২% ৫৭% ৪০% ৫৫০
২০১৯ ৬৫% ৬১% ৪২% ৫৮০
২০২০ ৬৯% ৬৪% ৪৫% ৬২০
২০২১ ৭৩% ৬৯% ৪৮% ৬৫০
২০২২ ৭৬% ৭২% ৫০% ৬৭০

উৎস: IEDCR, DGDA এবং MOHFW-এর সম্মিলিত বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১৮-২০২২) থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (MOHFW) তত্ত্বাবধানে এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর সক্রিয় অংশগ্রহণে বিদ্যমান 'ওষুধ আইন, ২০১৮' (সংশোধিত) কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ হয় এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) যৌথভাবে একটি জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মনিটরিং ও সার্ভেইলেন্স প্রোগ্রাম (NAMRSP) প্রতিষ্ঠা করবে, যা দেশের সকল বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে নিয়মিত রেজিস্ট্যান্স ডেটা সংগ্রহ করবে এবং এই ডেটার ভিত্তিতে জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের গাইডলাইন (National Antibiotic Use Guideline) নিয়মিত হালনাগাদ করবে।
  • প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং মৎস্য অধিদপ্তরকে 'পশু ও মৎস্য খাদ্য ও ওষুধ আইন, ২০১৫' এর আওতায় অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধে কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে এবং খামারিদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রচারাভিযান পরিচালনা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator