পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত রপ্তানি: নতুন বাজার না পুরনো ফাঁদ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত রপ্তানি: নতুন বাজার না পুরনো ফাঁদ?

মেহেদী হাসান  avatar   
মেহেদী হাসান
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত রপ্তানি: নতুন বাজার না পুরনো ফাঁদ?
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত রপ্তানি: নতুন বাজার না পুরনো ফাঁদ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক অ...

সম্প্রতি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মুখে দেশের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে অপ্রচলিত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা পোশাক খাতের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। এই প্রবৃদ্ধি কি কেবলই একটি নতুন দিগন্তের সূচনা, নাকি পশ্চিমা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নতুন ভূখণ্ডে প্রবেশ করার পেছনে লুকিয়ে আছে পুরনো ফাঁদের পুনরাবৃত্তি?

বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ঐতিহ্যগতভাবে এই পোশাকের প্রধান বাজার। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মানবাধিকার, শ্রমমান ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান চাপ, বিশেষ করে সম্ভাব্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি, বাংলাদেশকে নতুন করে তার রপ্তানি কৌশল নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। এই প্রেক্ষাপটে, অপ্রচলিত পণ্য যেমন চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি পণ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং ছোট ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যা অপ্রচলিত পণ্যের জন্য নতুন বাজার উন্মোচনে সহায়ক হতে পারে। তবে, এই নতুন বাজারগুলো প্রায়শই উন্নয়নশীল দেশ বা উদীয়মান অর্থনীতির অংশ, যেখানে পণ্যের মূল্য এবং ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অপ্রচলিত রপ্তানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা একদিকে যেমন দেশের রপ্তানি ঝুড়িকে বৈচিত্র্যময় করছে, অন্যদিকে এর সাথে জড়িত চ্যালেঞ্জগুলোও কম নয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি গন্তব্যগুলো প্রায়শই একক বাজার বা সীমিত কয়েকটি বাজারের উপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি পণ্যের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যায়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অভ্যন্তরীণ নীতি পরিবর্তন রপ্তানি প্রবাহে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া, এসব বাজারে প্রবেশাধিকার ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য মান নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের সার্টিফিকেশন এবং লজিস্টিক সাপোর্টে বিনিয়োগ অপরিহার্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর তথ্য অনুযায়ী, অপ্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণ, বিশেষ করে উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে সরলীকরণ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর মাধ্যমে মূলধন বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেলে অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও আধুনিকায়নে বিনিয়োগ সহজ হবে, যা তাদের আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সহায়তা করবে। তবে, নতুন বাজারগুলোর স্থিতিশীলতা, তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং পশ্চিমা বাজারের মতো প্রিমিয়াম মূল্য প্রদানের আগ্রহ কতটা, তা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। পুরনো ফাঁদ বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে, পশ্চিমা বাজারের উচ্চ মূল্যের সুবিধা হারিয়ে কম মূল্যের বাজারে প্রবেশ করে মোট রপ্তানি আয় বা মুনাফা কমে যাওয়ার ঝুঁকি।

খাত ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি (বিলিয়ন USD) ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি (বিলিয়ন USD) ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি (বিলিয়ন USD) ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি (%)
মোট রপ্তানি ৩৮.৭৬ ৫২.০৮ ৫৫.৫৬ ৬.৬৭
তৈরি পোশাক (RMG) ৩১.৪৬ ৪২.৬১ ৪৬.৯৯ ১০.২৮
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ১.১২ ১.২৫ ১.৩৫ ৮.০০
পাট ও পাটজাত পণ্য ১.১৬ ১.১২ ০.৯৯ -১১.৬০
কৃষি পণ্য ১.০৩ ১.১৬ ১.৩০ ১২.০৭
হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ ০.৪৩ ০.৫৩ ০.৪৮ -৯.৪৩
অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্য ৩.৫৬ ৪.৬২ ৫.৪৫ ১৮.০০

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (বাৎসরিক প্রতিবেদন)

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'জাতীয় রপ্তানি কৌশল ২০৩০' (National Export Strategy 2030) এর অধীনে অপ্রচলিত পণ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজার উন্নয়ন রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রতিটি পণ্যের জন্য সম্ভাব্য নতুন বাজারের চাহিদা, প্রবেশাধিকারের শর্তাবলী এবং প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে রপ্তানিমুখী অপ্রচলিত শিল্পগুলোর জন্য 'কাঁচামাল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার স্কিম' (Raw Material Import Duty Exemption Scheme) কার্যকর করতে হবে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক রেয়াত সুবিধা দিতে হবে, যা উৎপাদকদের খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণে সহায়তা করবে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে যৌথভাবে অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য 'বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল' (Special Investment Fund) গঠন করতে হবে এবং এই তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ ও ইক্যুইটি সহায়তা প্রদানের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা তাদের প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator