ডিজিটাল আসক্তি ও মানসিক ফিটনেস: প্রযুক্তি কি কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সুস্থ মন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল আসক্তি ও মানসিক ফিটনেস: প্রযুক্তি কি কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সুস্থ মন?

রনি চৌধুরী  avatar   
রনি চৌধুরী
ডিজিটাল আসক্তি ও মানসিক ফিটনেস: প্রযুক্তি কি কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সুস্থ মন?
ডিজিটাল আসক্তি ও মানসিক ফিটনেস: প্রযুক্তি কি কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সুস্থ মন?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক গেমিং ডিসঅর্ডারকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করার বিষয়টি ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে নতুন করে আলো...

সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক গেমিং ডিসঅর্ডারকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করার বিষয়টি ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা উস্কে দিয়েছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট। যেমন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NMHI) ও হাসপাতাল পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রায় ১৫% অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং মানসিক ফিটনেসকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি ইঙ্গিত; প্রযুক্তির সর্বব্যাপী বিস্তার আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ভিত্তিকে ঠিক কতটা ক্ষয় করছে, তা আরও গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

প্রযুক্তির এই আগ্রাসী বিস্তার কেবল গেমিং ডিসঅর্ডারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিরন্তর ব্যবহার মস্তিষ্কের ডোপামিন নির্ভরতা বাড়িয়ে তুলছে, যা এক ধরনের ডিজিটাল আসক্তির জন্ম দিচ্ছে। নিউরোসায়েন্স জার্নাল 'কগনিটিভ নিউরোসায়েন্স'-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, স্ক্রিন টাইম বৃদ্ধির ফলে প্রাক-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী। এর ফলস্বরূপ, তরুণ প্রজন্ম বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তাদের সহানুভূতি এবং সহনশীলতার মাত্রা কমে যাচ্ছে এবং তারা ভার্চুয়াল জগতে একটি মিথ্যা পরিতৃপ্তি খুঁজে ফিরছে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত 'জাতীয় কিশোর স্বাস্থ্য কৌশলপত্র ২০২৩'-এর প্রাথমিক খসড়ায় এই বিষয়টি উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ডিজিটাল মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সাইবার বুলিং, আত্মমর্যাদার অভাব এবং শরীর-সচেতনতা সংক্রান্ত মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে একটি মানসিকভাবে ভঙ্গুর সমাজ তৈরি করতে পারে, যেখানে ব্যক্তিগত সুস্থতা এবং সামাজিক সংহতি উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে।

ডিজিটাল আসক্তির এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবেলায় একটি সমন্বিত এবং বহু-মাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক এবং নীতিগত হস্তক্ষেপও প্রয়োজন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের সাম্প্রতিক 'হেলথ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম'-এর আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মানসিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্য সরঞ্জাম এবং আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এই সহায়তার অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। তবে, মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রকল্পগুলোকে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নে সীমাবদ্ধ না রেখে, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল আসক্তি নির্ণয়ের জন্য আধুনিক পদ্ধতি প্রবর্তন এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনের মতো দেশগুলো তাদের শিক্ষা কারিকুলামে ডিজিটাল সুস্থতা (Digital Wellbeing) অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই ডিজিটাল মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার এবং এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষাদান করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, পাঠ্যক্রম সংস্কারের পাশাপাশি পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি, যাতে শিশুরা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তিজনিত উদ্বেগ/বিষণ্ণতার হার (%) ৮.৫% ১০.২% ১৩.১% ১৫.৪%
দৈনিক স্ক্রিন টাইম (গড় ঘণ্টা) ৪.২ ৫.১ ৬.০ ৬.৮
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ডিজিটাল আসক্তি সংক্রান্ত নতুন রোগীর আগমন (সংখ্যা) ৩২০ ৪৫০ ৬১০ ৭৮০
স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ঘুমের সমস্যায় ভোগা (%) ১২.০% ১৪.৫% ১৭.৩% ২০.১%

উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NMHI) ও হাসপাতাল, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং World Bank-এর 'Digital Development Report' থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'জাতীয় ডিজিটাল সুস্থতা নীতি' (National Digital Wellbeing Policy) প্রণয়ন করবে, যেখানে শিক্ষা কারিকুলামে প্রাথমিক স্তর থেকেই ডিজিটাল সাক্ষরতা ও আসক্তি প্রতিরোধের বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি ছয় মাসে একবার করে শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল আসক্তি স্ক্রিনিং ও কাউন্সেলিং সেশন বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, World Bank এবং ADB-এর সহায়তায়, প্রতিটি জেলা সদরে কমপক্ষে একটি করে 'ডিজিটাল আসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র' (Digital Addiction Treatment and Rehabilitation Center) স্থাপন করবে, যা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NMHI)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে এবং যেখানে অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও থেরাপিস্টদের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা প্রদান করা হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) 'ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ আইন' (Digital Platform Regulation Act) প্রণয়ন করবে, যার মাধ্যমে অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বয়স যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা হবে, দৈনিক ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণের জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান (যেমন পপ-আপ রিমাইন্ডার) অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং শিশুদের জন্য ক্ষতিকর কনটেন্ট ফিল্টারিং এর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রনি চৌধুরী

রনি চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator